গাজা যুদ্ধ নিয়ে তৈরি নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’কে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি কেবল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভিযান নয়। আরও গভীর প্রশ্ন হলো—আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে কীভাবে একজন মানুষকে একটি ‘লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত করা হয়, এবং সেই লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে থাকা অন্য মানুষের মৃত্যুকে কীভাবে একটি অনুমোদিত সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব হয়।
ছবিটির বিশেষত্ব এখানেই। এখানে যুদ্ধের প্রচলিত দৃশ্য—ধ্বংসস্তূপ, রক্তাক্ত মরদেহ কিংবা কান্নারত শিশু—প্রধান বিষয় নয়। বরং সাক্ষাৎকারে উঠে আসে এমন এক সামরিক ব্যবস্থার বিবরণ, যেখানে গাজার মানুষের ওপর ব্যাপক নজরদারি চালানো হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করে এবং এরপর নির্ধারিত হয় একটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে কতজন আশপাশের মানুষ মারা যেতে পারে।
এই কাঠামো যুদ্ধের নৈতিকতাকে এক ভয়ংকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।
শত্রু শনাক্ত করার যন্ত্র কতটা নির্ভুল?
প্রামাণ্যচিত্রে যেসব সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক সেনাসদস্যের বক্তব্য এসেছে, তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা ব্যবস্থায় মানুষের চলাফেরা, ফোন যোগাযোগ এবং সামাজিক সম্পর্কসহ নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ‘সন্ত্রাসী’ শনাক্ত করা হয়।

কিন্তু এই প্রযুক্তি ভুল করতে পারে—এ কথাও স্বীকার করা হয়েছে। একজন সাধারণ বেকার, যার দোকান কোনো সন্দেহভাজন স্থাপনার কাছে, তার চলাফেরা বা যোগাযোগের ধরন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে একজন হামাস যোদ্ধার আচরণের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন যন্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস একজন মানুষকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর সে হয়ে ওঠে সামরিক লক্ষ্য। তার পরিবারের সদস্য, সহকর্মী কিংবা আশপাশে থাকা মানুষও হামলার শিকার হতে পারেন।
এখানে ‘নাজা’ নামের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সময় কতজন বেসামরিক মানুষ নিহত হতে পারেন, সেই অনুমোদিত সংখ্যাকেই ছবিটি আলোচনায় এনেছে। লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্ব যত বেশি, অনুমোদিত মৃত্যুর সংখ্যাও তত বাড়তে পারে—২০, ৫০, এমনকি ১০০ জন পর্যন্ত।
অর্থাৎ, মানুষের জীবন এখানে আর একেকটি স্বতন্ত্র নৈতিক মূল্য নয়; তা একটি সামরিক হিসাবের অংশ হয়ে যায়।
‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির বিপজ্জনক ব্যবহার
প্রামাণ্যচিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির ব্যবহার। ছবিতে ১৯৮৬ সালের একটি পুরোনো টেলিভিশন অনুষ্ঠানের অংশ দেখানো হয়েছে, যেখানে তরুণ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সন্ত্রাসবাদের একটি সংজ্ঞা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর সংজ্ঞায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের ওপর পরিকল্পিত হামলা, হত্যা ও ভয় সৃষ্টি সন্ত্রাসবাদের বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু একই সংজ্ঞাকে যদি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন তৈরি হয়—কোনো পক্ষের পরিচয় কি একই ধরনের কর্মকাণ্ডের নৈতিক মূল্যায়ন বদলে দিতে পারে?

এখানেই ছবিটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আসে। কোনো মানুষকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার পর তাকে হত্যা করা হলে সেটিকে সামরিক অভিযান বলা হয়। কিন্তু একই হামলায় নিহত অন্য মানুষগুলোকে বলা হয় অনুমোদিত পার্শ্বক্ষয়ক্ষতি। শব্দ বদলে যায়, কিন্তু মানুষের মৃত্যু বদলায় না।
একই দ্বন্দ্ব ব্যক্তিজীবনেও
এই দ্বন্দ্ব কেবল রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লেখক ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা জোনাথন ডেকেলের অভিজ্ঞতার মধ্যেও একই বৈপরীত্য দেখতে পান।
ডেকেল একসময় ইসরায়েলের একটি অভিজাত গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করেছেন। পরে তিনি ইহুদি ও ফিলিস্তিনি পরিবারের সহাবস্থানের একটি শান্তিপূর্ণ বসতিতে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা যেন সামরিক বাহিনীতে না যায়। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তিনি নিজে পুরোনো ইউনিটে ফিরে গিয়ে রিজার্ভ দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রায় দুই বছর সামরিক বাহিনীতে ছিলেন।
একদিকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বপ্ন, অন্যদিকে সামরিক দায়িত্ব—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে থাকা মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গিও তাই দ্বিধায় ভরা। তিনি গাজায় ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি স্বীকার করলেও এটিকে গণহত্যা না বলে যুদ্ধ হিসেবে দেখেন।
এই অবস্থানই মূল বিতর্ককে আরও কঠিন করে তোলে। কারণ যুদ্ধের ভেতরে থাকা একজন মানুষের কাছে একই ঘটনা একদিকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, অন্যদিকে সামরিক প্রয়োজন হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে।

সংখ্যার বাইরে যে বাস্তবতা
‘নাজা’ শেষ পর্যন্ত একটি শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। একটি সামরিক ব্যবস্থায় যখন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা এবং প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে নিহত হতে পারে এমন মানুষের সংখ্যা গুণ করা হয়, তখন পুরো একটি জনপদকে মৃত্যুর সম্ভাব্য তালিকায় নিয়ে আসা সম্ভব।
তখন প্রশ্ন আর থাকে না—কোন ব্যক্তি ভুল করে নিহত হয়েছেন। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, এমন একটি ব্যবস্থা কীভাবে তৈরি হলো যেখানে ভুল, সন্দেহ এবং অনুমোদিত পার্শ্বক্ষয়ক্ষতি মিলিয়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু একটি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধের ভাষা এই বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে। ‘লক্ষ্যবস্তু’, ‘সন্ত্রাসী’, ‘পার্শ্বক্ষয়ক্ষতি’—প্রতিটি শব্দ মৃত্যুকে প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত পরিভাষায় পরিণত করে। কিন্তু নিহত মানুষের কাছে এসব শ্রেণিবিন্যাসের কোনো অর্থ নেই।
‘নাজা’ তাই শুধু গাজার যুদ্ধ নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নয়। এটি সেই আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষকে শনাক্ত করে যন্ত্র, সিদ্ধান্ত নেয় মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, আর মৃত্যুকে পরিমাপ করা হয় সংখ্যায়।
শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি কোনো একটি শব্দ ব্যবহারের মধ্যে আটকে থাকে না। আসল প্রশ্ন হলো—যখন একটি ব্যবস্থায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু আগে থেকেই হিসাবের অংশ হয়ে যায়, তখন তাকে কেবল যুদ্ধের স্বাভাবিক পরিণতি বলে ব্যাখ্যা করার সীমা কোথায়?












