আফগানিস্তানের নুরিস্তান প্রদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতার সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় আফগান তালেবান সরকারের এমন দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’, ‘মনগড়া’ ও ‘সত্যবর্জিত’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
রোববার পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ফ্যাক্ট-চেক’ অ্যাকাউন্ট থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, নুরিস্তানে কথিত অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার কোনো সত্যতা নেই।
বিবৃতিতে বলা হয়, আফগানিস্তানের নুরিস্তানে সহিংসতার সঙ্গে পাকিস্তানকে যুক্ত করার যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। পাকিস্তান দাবি করেছে, এ অভিযোগের সমর্থনে কোনো ব্যক্তির পরিচয়, নথি, যোগাযোগের তথ্য, ফরেনসিক প্রমাণ বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য সামনে আনা হয়নি।
এর আগে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট কিছু ব্যক্তি সীমান্ত পেরিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে নুরিস্তানের সাম্প্রতিক সহিংসতায় অংশ নিয়েছে। সেই অভিযোগের জবাবেই ইসলামাবাদ এ অবস্থান জানাল।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, ভিডিওতে কয়েকজন নিরস্ত্র ব্যক্তিকে আটকের দৃশ্য দেখা গেলেও তাদের পরিচয় বা পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ইসলামাবাদের ভাষ্য, ভিডিওটি পরিকল্পিতভাবে ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে এবং এটি দিয়ে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা যায় না।
পাকিস্তান আরও বলেছে, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যার দায় অন্য দেশের ওপর চাপানোর পরিবর্তে তালেবান সরকারের উচিত দেশটির ভূখণ্ডে সক্রিয় সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে আফগান মাটি যেন পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়—এ বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে ইসলামাবাদ।

সন্ত্রাসী সংগঠন নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় আরও দাবি করেছে, আফগানিস্তানে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠনের উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ডের বিষয়টি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডে এসব সংগঠনের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে। পাকিস্তানের দাবি, নুরিস্তানের সহিংসতার সঙ্গে পাকিস্তানের যোগসূত্র তৈরির চেষ্টা আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর উপস্থিতির বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারবে না।
পাকিস্তান বিশেষ করে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির বিরুদ্ধে আফগান ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। ইসলামাবাদ নিয়মিতভাবে কাবুলকে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জন্য প্রস্তুত করা একটি সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়ে আফগান তালেবানের সঙ্গে টিটিপির সম্পর্ক পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা ও প্রাণঘাতী মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে প্রতিবেদনে এটিও বলা হয়েছে, টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কাবুল কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছিল।
প্রতিবেদনে টিটিপি, আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট-খোরাসান ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির মধ্যে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ ও সহযোগিতার কথাও উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বরেই নতুন করে বেড়েছে উত্তেজনা
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরেই সীমান্ত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ। সেপ্টেম্বর মাসে দুই দেশের মধ্যে এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলার পর গত ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় কথিত সন্ত্রাসী আস্তানা লক্ষ্য করে ‘পরিমিত’ বা ‘নির্দিষ্ট মাত্রার’ বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তান সরকারের দাবি, ওই অভিযানে ২৮ জনের বেশি সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, ওই অভিযান ‘অপারেশন গজব লিল হক’-এর অংশ। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবানের পক্ষ থেকে সীমান্তে গুলিবর্ষণের পর এই অভিযান শুরু করা হয়েছিল।
এর কয়েক দিন পর সীমান্তের ওপার থেকে আসা আটটি ড্রোন পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলো ভূপাতিত করার দাবি করে। টোরখাম সীমান্ত ও কোহাটের কাছে এসব ড্রোন প্রবেশ করেছিল বলে পাকিস্তান জানিয়েছে।
পরে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ১০টি স্থানে ‘নির্ভুল বিমান ও ড্রোন হামলা’ চালানোর কথা জানায়। এর পাশাপাশি কুররম এলাকায় সন্ত্রাসীদের পাকিস্তানে ঢোকার একটি চেষ্টা নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিহত করেছে বলেও ইসলামাবাদ দাবি করে।
আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর আফগান পক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা ডিমার্শে হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর রোববার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এর আগে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাকিস্তানের একটি সীমান্তচৌকি ধ্বংসের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছিল ইসলামাবাদ। বেলুচিস্তানের স্পিন বোলদাক সীমান্তের কাছে ওই পোস্ট ধ্বংসের দাবি করা হয়েছিল বলে আফগান পক্ষ জানিয়েছিল।
সব মিলিয়ে নুরিস্তানের সহিংসতা নিয়ে নতুন করে ওঠা অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে চলমান অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। একদিকে কাবুল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আফগান ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ করছে, অন্যদিকে ইসলামাবাদ বলছে, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াই পাকিস্তান ও পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।









