গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটি থেকে শেষ মার্কিন ও জোট সেনারা বিদায় নিয়েছেন। পেন্টাগন একে সুশৃঙ্খল প্রস্থান বলেছে। হোয়াইট হাউস বলছে বিজয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরো অভিযানকে নরকে এক ব্যয়বহুল ভ্রমণ বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মার্কিন বিশ্লেষক লিওন হাদার এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই সরে যাচ্ছে? তাঁর উত্তর, ইরাক থেকে প্রস্থান বাস্তব, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসা বাস্তব নয়।
হাদার মনে করিয়ে দেন, এটি দ্বিতীয়বার ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। প্রথমবার ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ওবামা প্রশাসন ২০০৩ সালের যুদ্ধের অধ্যায় শেষ করেছিল। তিন বছরও যায়নি, ইসলামিক স্টেটের উত্থান মার্কিন সেনাদের আবার টেনে আনে। সাময়িক বলে শুরু হওয়া সেই অভিযান চলে ১২ বছর। হাদারের মতে, ধরনটি পরিচিত। ওয়াশিংটন বড় লক্ষ্য নিয়ে অঞ্চলে ঢোকে, স্থানীয়দের ভিন্ন হিসাবের মুখে পড়ে, বিজয় ঘোষণা করে বেরিয়ে যায়। তারপর সেই শূন্যতাই পরের হস্তক্ষেপের অজুহাত হয়। ইরাকে সাড়ে চার হাজারের বেশি মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। তবু অঞ্চলটি আগের চেয়ে স্থিতিশীল বা গণতান্ত্রিক হয়নি।
নিবন্ধের কেন্দ্রীয় যুক্তি এই সময়ের অসংগতি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসনের করা সমঝোতা অনুযায়ী ইরাক ছাড়ছে। অথচ একই সময়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। হাদারের ভাষায়, সত্যিকারের সরে আসা এমন হয় না। আইএসবিরোধী অভিযানের সদর দপ্তর শুধু জর্ডানে সরানো হয়েছে। সিরিয়ায় এখনো কয়েক শ মার্কিন সেনা আছেন। উপসাগরের ঘাঁটি ও বিমানবাহী রণতরী সবই রয়ে গেছে। ইরাক থেকে প্রস্থান তাই আসলে পুনর্বিন্যাস। ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের লক্ষ্যবস্তু কমল, আর ইরানের বিরুদ্ধে কাজ করার স্বাধীনতা বাড়ল। লেখকের মতে, সামরিক যুক্তিতে এটি ঠিক হতে পারে, কিন্তু এটি নতুন কোনো কৌশল নয়। তাঁর চোখে এটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসা নয়, বরং সেনা মোতায়েনের মানচিত্র বদল।
হাদার কুর্দিদের উদ্বেগকে উড়িয়ে দেননি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা এক হাজারের বেশি ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সয়েছে। তবে তাঁর মতে, এর সমাধান কূটনীতি ও অস্ত্র বিক্রি, স্থায়ী মার্কিন উপস্থিতি নয়। তিনি মনে করিয়ে দেন, দেড় লাখের বেশি মার্কিন সেনা ইরাকে থাকার সময়েই সেখানে ইরানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল। তিনি পরামর্শ দেন, যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলের পুলিশের ভূমিকা ছেড়ে দূর থেকে ভারসাম্য রক্ষাকারীর ভূমিকা নিক। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই বড় জ্বালানি উৎপাদক, আর উপসাগরের তেল যায় মূলত এশিয়ায়। বাংলাদেশের পাঠকের জন্য এই কথাটিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। উপসাগরের তেলের বড় ক্রেতা এশিয়ার দেশগুলোই, বাংলাদেশও তাদের একটি। সেখানে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক ও দেশের জ্বালানি আমদানি দুটিই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে বাঁধা।
হাদারের শেষ কথা একটি শর্ত। ইরাক থেকে প্রস্থান অর্থবহ হবে তখনই, যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হবে আলোচনার মাধ্যমে, উত্তেজনা বাড়িয়ে নয়। নইলে ইতিহাস এরবিল থেকে বিদায়কে মধ্যপ্রাচ্যের জলাভূমি থেকে মুক্তি হিসেবে মনে রাখবে না। মনে রাখবে পরের অঙ্ক শুরুর আগের একটি বিরতি হিসেবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসা তাই এখনো ঘোষণা, বাস্তবতা নয়।












