সৌদি আরব চীনের নেতৃত্বাধীন ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন প্ল্যাটফর্ম এমব্রিজ থেকে সরে গেছে। খবরটি প্রকাশ্যে এসেছে সেপ্টেম্বরে। অথচ সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের মে মাসে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে আর্থিক বিশ্লেষক মাত্তেও জিওভান্নিনি সৌদি আরবের এমব্রিজ ত্যাগের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। এশীয় বাজার ও আন্তঃসীমান্ত প্রকল্প অর্থায়নে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর মূল যুক্তি, ডলারমুক্তির আলোচনা যতটা নাটকীয় শোনায়, বাস্তব ততটা নয়। দেশগুলো ডলার ছাড়তে চায় না। তারা চায় ডলারের পাশাপাশি সস্তা ও দক্ষ বিকল্প।
এমব্রিজ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক একটি আন্তঃসীমান্ত লেনদেন প্ল্যাটফর্ম। চীন, হংকং, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এর সদস্য। এ বছর ম্যাকাও যোগ দিয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো সরাসরি সীমান্ত পেরিয়ে লেনদেন ও মুদ্রা বিনিময় করতে পারে। চীনের জন্য এটি আন্তর্জাতিক লেনদেনে নিজস্ব মুদ্রার ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ। ২০২৪ সালে সৌদি আরব পূর্ণ সদস্য হলে প্রকল্পটি নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়। অনেকে একে তেল বাণিজ্যে ডলারের বিকল্প পথ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। সৌদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন জানিয়েছে, তাদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে, যা ২০২৫ সালের ১৩ মে শেষ হয়। আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যাংক বা বিআইএসের সহায়তায় প্রকল্পটি গড়ে উঠেছিল। পরে বিআইএস নিজেকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে নেয়।
জিওভান্নিনির মতে, রিয়াদের সিদ্ধান্ত আদর্শগত নয়, বাস্তবমুখী। সৌদি মুদ্রা ডলারের সঙ্গে বাঁধা। দেশটির তেলের দাম নির্ধারিত হয় ডলারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও আর্থিক সম্পর্কও গভীর। এমন দেশের পক্ষে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। লেখকের ব্যাখ্যায়, ডলারমুক্তির সীমা এখানেই। প্রযুক্তিগত বিকল্প তৈরি হলেই মুদ্রার ভারসাম্য বদলে যায় না। আর্থিক ডলারমুক্তি তাই ডলারের আধিপত্যের অবসান নয়। বরং এটি ডলারকে কেন্দ্রে রেখে চারপাশে বিকল্পের পরিসর ধীরে ধীরে বাড়ানো। তাঁর মতে, সেটিও বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন। লেখকের চোখে সৌদি আরবের এমব্রিজ ত্যাগ তাই কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার ঘোষণা নয়। এটি খরচ ও সুবিধার হিসাব।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এই যুক্তির সঙ্গে মেলে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ডলার সংকট দেখিয়েছে, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ডলারের ঘাটতিতে কতটা নাজুক। ২০২৩ সালে ভারতের সঙ্গে টাকা ও রুপিতে বাণিজ্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। চীনা মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশের দাম এখনো ডলারেই পরিশোধ করতে হয়। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ও আসে মূলত ডলারে। তাই বিকল্প ব্যবস্থার খরচ ও কার্যকারিতা যাচাই না করে ডলার থেকে সরে আসা ঝুঁকিপূর্ণ। জিওভান্নিনির কথাই তাই বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ। ডলার ছাড়া নয়, ডলারের পাশাপাশি বিকল্প চ্যানেল গড়ে তোলাই হতে পারে ডলারমুক্তির সীমার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
এই ঘটনার সবচেয়ে কৌতূহলজাগানিয়া দিক হলো নীরবতা। সৌদি আরব প্ল্যাটফর্ম ছেড়েছে ২০২৫ সালের মে মাসে। অথচ বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে লেগেছে প্রায় ১৬ মাস। এই সময়ে সদস্য দেশগুলোর কেউই ঘোষণা দেয়নি। সৌদি আরবের এমব্রিজ ত্যাগ এত দিন চাপা থাকাই বলে দেয়, ডলারের বিকল্প গড়ার লড়াই প্রযুক্তির চেয়ে রাজনীতির বেশি।












