বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে থাকা একটি মালয়েশিয়াগামী নৌকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৭৬ জনকে। উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। নৌকাটি অবৈধভাবে সাগরপথে মানুষ নিয়ে মালয়েশিয়া যাচ্ছিল। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ১১ জনকে মানব পাচার চক্রের সদস্য সন্দেহে আটক করা হয়েছে। বাকি ৬৫ জন পাচারের শিকার বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী। শুক্রবার সকালে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বুধবার রাতে সেন্ট মার্টিন বাতিঘর থেকে প্রায় ৮১ নটিক্যাল মাইল দূরে কাঠের নৌকাটি ভাসছিল। প্রথমে নৌকাটি দেখতে পায় এফভি ক্রিস্টাল-১ নামের একটি মাছ ধরার নৌযান। আরোহীদের অবস্থা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় নৌযানটির কর্মীরা নৌবাহিনীকে খবর দেন। সে সময় সেন্ট মার্টিন এলাকায় নিয়মিত টহলে ছিল নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ। জাহাজটি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ উদ্ধারে বড় ভূমিকা রেখেছে একটি মাছ ধরার নৌযানের সতর্কতা। গভীর সাগরে বিকল নৌকাটি চোখে পড়ার পর নৌযানটির কর্মীরা শুধু কাছে যাননি, সন্দেহজনক পরিস্থিতির কথাও নৌবাহিনীকে জানিয়েছেন। ফলে দ্রুত জাহাজ পাঠানো সম্ভব হয়েছে। সাগরপথে পাচার ঠেকাতে উপকূলের জেলেদের এমন সতর্কতা কতটা কাজে আসতে পারে, এ ঘটনা তার উদাহরণ।
নৌবাহিনী জানায়, নৌকাটিতে তখন পানি ঢুকছিল। নৌসদস্যরা পানি সেচে নৌকাটিকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন। এরপর ৭৬ জনকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ১১ জনকে পাচার চক্রের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়। আটক ব্যক্তিদের ও জব্দ নৌকাটি আইনি ব্যবস্থার জন্য টেকনাফ থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের বেশির ভাগকে চক্রটি অপহরণ করেছিল। পরে তাঁদের টেকনাফের দুর্গম এলাকায় আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাঁদের নৌকায় তোলা হয়। অন্যরা মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভনে প্রতারিত হয়েছিলেন। মালয়েশিয়াগামী নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষদের এই বিবরণ বলছে, পাচারকারীরা প্রলোভনের পাশাপাশি জোর খাটিয়েও মানুষকে নৌকায় তুলছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা দেশের কোন কোন এলাকার বাসিন্দা, বিজ্ঞপ্তিতে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম বড় গন্তব্য। বৈধ পথে যাওয়ার খরচ ও জটিলতার সুযোগ নেয় দালাল চক্র। কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল দীর্ঘদিন ধরে সাগরপথে মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অতীতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এবারও ইঞ্জিন বিকল নৌকায় খোলা সাগরে ভাসছিলেন ৭৬ জন। মাছ ধরার নৌযানটির চোখে না পড়লে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারত। তাই সাগরে টহলের পাশাপাশি সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। বৈধ পথে বিদেশে কর্মী পাঠানো সহজ ও সাশ্রয়ী না হলে দালালের ফাঁদ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। নৌবাহিনী জানিয়েছে, দেশের সমুদ্রসীমায় মানব পাচার, চোরাচালান ও অন্যান্য অবৈধ কার্যক্রম ঠেকাতে তাদের নিয়মিত টহল চলবে। তবে সাগরে ধরা পড়া চক্রের সদস্যরা পাচারের শেষ ধাপ মাত্র। টেকনাফের যে আস্তানায় মানুষদের আটকে রাখা হয়েছিল, সেই স্থল নেটওয়ার্ক ভাঙা না গেলে মালয়েশিয়াগামী নৌকা থেকে উদ্ধারের খবর বারবারই আসবে।












