গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কিংবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তাঁর সিদ্ধান্ত, স্বার্থ ও সম্পদের বিষয়ে নাগরিকের জানার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই সম্পদ ও দায়ের বিবরণ প্রকাশ, তথ্য অধিকার এবং সরকারি নথিতে নাগরিকের প্রবেশাধিকার কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এগুলো রাষ্ট্রের প্রতি জনআস্থার মৌলিক ভিত্তি।
পাকিস্তানে সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ সেই ভিত্তি নিয়েই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় পরিষদ নির্বাচন আইনের ১৩৮ ধারা সংশোধনের একটি বিল পাস করে। এতে কোনো আইনপ্রণেতার জীবন বা নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনসভার স্পিকার মনে করলে নির্বাচন কমিশনকে তাঁর সম্পদ ও দায়ের বিবরণ গোপন রাখার অনুরোধ করার সুযোগ তৈরি হয়। বিলটি সিনেটে পাঠানো হলেও ৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত তা পাস হয়নি।
এর আগেও আইনপ্রণেতাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ সীমিত করার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে এসব তথ্য প্রকাশের প্রচলন বন্ধ হওয়ার পর নাগরিকদের জটিল প্রক্রিয়ায় মুদ্রিত গেজেট কিনে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। ফলে আইনে স্বচ্ছতার যে উদ্দেশ্য ছিল, বাস্তবে তার নাগাল আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য কতটা প্রকাশ্য হবে—এই প্রশ্ন পাকিস্তানে নতুন নয়। ২০১৭ সালের নির্বাচন আইন নির্বাচনী সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনলেও প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আগে যে বিস্তৃত শপথনামাগুলো জমা দিতে হতো, তার বড় অংশ বাদ পড়ে। এসব ঘোষণায় প্রার্থীর সম্পদ, দায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর পরিশোধ এবং নিবন্ধিত ফৌজদারি মামলার মতো তথ্য থাকত। ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই তথ্যগুলোর গুরুত্ব ছিল সরাসরি। পরে নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের উদ্যোগে বিষয়টি আদালতে যায় এবং ২০১৮ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট হলফনামা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা পুনর্বহাল করে।
গোপনীয়তা বনাম জনস্বার্থ
উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলছে। স্বচ্ছতার পক্ষের যুক্তি হলো, সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হলে দায়িত্ব পালনের সময় কারও সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, অবৈধ সম্পদ সঞ্চয়ের সম্ভাবনা রয়েছে কি না কিংবা স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে কি না—তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁদের যুক্তি, সম্পদের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ তাঁদের এবং পরিবারের সদস্যদের চাঁদাবাজি, অপহরণ বা লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমে বিচার শুরু হওয়ার আশঙ্কাও তাঁরা তুলে ধরেন।
দুই পক্ষের যুক্তিরই বাস্তব ভিত্তি থাকতে পারে। কিন্তু সমাধান হওয়া উচিত এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত হবে এবং একই সঙ্গে প্রকৃত নিরাপত্তা-ঝুঁকির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও সীমিত সুরক্ষা থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ব্যতিক্রম যেন সাধারণ নিয়মকে অকার্যকর করার পথ না হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক চাপের অস্বস্তিকর বাস্তবতা
সম্পদ প্রকাশের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শাসন ও দুর্নীতি-সংক্রান্ত মূল্যায়নের পর। সংস্থাটির শাসন ও দুর্নীতি-সংক্রান্ত মূল্যায়নে উচ্চপর্যায়ের ফেডারেল সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ এবং ঝুঁকিভিত্তিক যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সুপারিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ শুরু এবং ছয় মাসের মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।
এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আসে। যে স্বচ্ছতা একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সুশাসনের স্বাভাবিক অংশ হওয়ার কথা, সেটি নিশ্চিত করতে কেন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চাপ প্রয়োজন হবে?
আন্তর্জাতিক চাপ কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিকল্প হতে পারে না। স্থায়ী স্বচ্ছতা গড়ে ওঠে দেশের নিজস্ব আইন, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে। বাইরে থেকে আসা শর্ত কোনো প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কিন্তু তা নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির বিকল্প নয়।
তথ্য অধিকার আইনের বাস্তব পরীক্ষা
পাকিস্তানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য শুধু আইন নয়, প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর রয়েছে এবং তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য তথ্য কমিশনও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আইনি কাঠামো থাকা এবং নাগরিকের হাতে বাস্তবে তথ্য পৌঁছানো—দুটি আলাদা বিষয়।
২০২০ সালের একটি ঘটনা এই ব্যবধানটি স্পষ্ট করে। সাংবাদিক রানা আবরার খালিদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাওয়া, নিজের কাছে রাখা এবং তোশাখানায় জমা দেওয়া উপহারের তথ্য চেয়েছিলেন। তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি পাকিস্তান তথ্য কমিশনে অভিযোগ করেন। কমিশন তথ্য চাওয়ার বৈধতা স্বীকার করে সরকারকে তা প্রকাশের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকার সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে যায়; আদালত সরকারের আবেদন খারিজ করে।
এই ঘটনাটি দেখায়, তথ্য চাওয়ার অধিকার আইনে স্বীকৃত থাকলেই যে নাগরিক সহজে তথ্য পাবেন, এর নিশ্চয়তা নেই। প্রশাসনিক প্রতিরোধ, আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত তথ্য অধিকারকে দুর্বল করে দিতে পারে।
একই প্রশ্ন বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও উঠেছে। ২০১৯ সালে কর্মীর সংখ্যা, শূন্য পদ, অস্থায়ী কর্মী, নতুন পদ, কর্মীদের লিঙ্গভিত্তিক বৈচিত্র্য এবং অনুমোদিত চাকরিবিধি সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আবেদনটি অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হলেও প্রধান বিচারপতি রেজিস্ট্রারকে তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরবর্তী প্রভাব হিসেবে উচ্চ আদালতগুলো তথ্য অধিকার আইনের আওতাভুক্ত কি না, সে বিষয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে লাহোর হাইকোর্টও ওই নজির উল্লেখ করে বিচারকদের সুযোগ-সুবিধা এবং তাঁদের ব্যবহৃত সরকারি যানবাহনের তথ্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জানায়, যদিও পাঞ্জাব তথ্য কমিশন আগে তথ্য দেওয়ার পক্ষে নির্দেশ দিয়েছিল। পরে কমিশন আদালতের রায়ের পর তার নির্দেশ প্রত্যাহার করে।

স্বচ্ছতার ক্ষয় ধীরে ধীরে ঘটে
স্বচ্ছতা সাধারণত একদিনে হারিয়ে যায় না। প্রথমে কোনো তথ্য প্রকাশের নিয়ম শিথিল হয়। পরে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হয়। এরপর কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেকে সাধারণ নিয়মের বাইরে রাখার যুক্তি দাঁড় করায়। একসময় আইনে তথ্য অধিকার বহাল থাকলেও বাস্তবে নাগরিকের কাছে সেই অধিকার প্রয়োগের পথ সংকুচিত হয়ে আসে।
এখানেই বিষয়টির গভীরতা। স্বচ্ছতা শুধু দুর্নীতি ধরার একটি উপায় নয়; এটি ক্ষমতার ওপর নাগরিকের নজরদারির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। সরকারি সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য যত বেশি গোপন থাকবে, স্বাধীনভাবে সেই ক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ তত কমবে।
অবশ্যই স্বচ্ছতার অর্থ নির্বিচারে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ বোঝায় না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বৈধ অধিকারও রক্ষা করতে হবে। কিন্তু সেই সুরক্ষা এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার, যাতে জনস্বার্থের তথ্য গোপন করার স্থায়ী অজুহাতে পরিণত না হয়।
একটি কার্যকর স্বচ্ছতা কাঠামোর জন্য তাই তিনটি বিষয় জরুরি: জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ব্যতিক্রমের নির্দিষ্ট সীমা এবং স্বাধীন পর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা।
গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচন আয়োজন বা নতুন আইন প্রণয়নের মধ্যেই নিহিত নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা উন্মুক্ত, ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত কতটা যাচাইযোগ্য এবং নাগরিক কতটা সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন—এসবও সুশাসনের মান নির্ধারণ করে।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তাই একটি মৌলিক সতর্কবার্তা দেয়। স্বচ্ছতার আইন থাকাই যথেষ্ট নয়; সেই আইনকে কার্যকর রাখার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিও প্রয়োজন। স্বচ্ছতা একবার সংকুচিত হতে শুরু করলে তার প্রভাব শুধু তথ্যের ওপর পড়ে না—দুর্বল হয় জবাবদিহি, ক্ষয় হয় জনআস্থা এবং শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের মানও কমে যায়।
আহমেদ বিলাল মেহবুব পাকিস্তানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিলড্যাটের সভাপতি।












