যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য বহু বছর ধরে ‘প্রাণঘাতী ইনজেকশন’কে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত, নির্ভরযোগ্য ও কম কষ্টদায়ক পদ্ধতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ব্যর্থতা সেই ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সর্বশেষ উদাহরণ টেনেসির ক্রিস্টা পাইক—দুই দফা ওষুধ প্রয়োগের পরও যিনি মারা যাননি এবং পরে হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়েছে।
৫০ বছর বয়সী পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করা হয় ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে। তিনি ১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। নির্ধারিত পদ্ধতিতে তার শরীরে পেন্টোবারবিটালের দুই ডোজ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবে মৃত্যু না হওয়ায় একপর্যায়ে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার আইনজীবীরা জানান, তিনি অচেতন অবস্থায় ভেন্টিলেটরে রয়েছেন। ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৬ সালে টেনেসিতে এটি ছিল দ্বিতীয় ব্যর্থ প্রাণঘাতী ইনজেকশন। এর আগে ২১ মে টনি ক্যারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় এক ঘণ্টারও বেশি চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় শিরার পথ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং গভর্নর বিল লি তাকে এক বছরের সাময়িক অব্যাহতি দেন।
শুধু টেনেসি নয়, বড় হচ্ছে জাতীয় প্রশ্ন
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে গবেষণা করা আমহার্স্ট কলেজের অধ্যাপক অস্টিন সারাটের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের প্রায় ৭.২ শতাংশ প্রয়োগ কোনো না কোনোভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। ওই সময় সব ধরনের মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি মিলিয়ে ব্যর্থতার হার ছিল প্রায় ৩.১৫ শতাংশ।
এর অর্থ হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় প্রাণঘাতী ইনজেকশন ঐতিহাসিকভাবে বেশি সমস্যাপ্রবণ ছিল। ২০১০ সালের পরও পরিস্থিতি সহজ হয়নি। সারাটের হিসাবে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণঘাতী ইনজেকশনে ব্যর্থতার হার প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে মৃত্যুদণ্ডে ব্যবহারের জন্য ওষুধ সংগ্রহের ক্রমবর্ধমান জটিলতা।
ওষুধ সংকট কীভাবে তৈরি হলো
প্রাণঘাতী ইনজেকশনের প্রচলিত পদ্ধতি তৈরি হয়েছিল ১৯৭৭ সালে ওকলাহোমায়। এর উদ্দেশ্য ছিল ফাঁসি, গুলি করে হত্যা, গ্যাস চেম্বার বা বৈদ্যুতিক চেয়ারের তুলনায় মৃত্যুদণ্ডকে কম নির্মম বলে উপস্থাপন করা। ১৯৮২ সালে টেক্সাসে প্রথম প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়।
প্রথম দিকের প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত একটি অচেতনকারী ওষুধের পর পক্ষাঘাত সৃষ্টিকারী ওষুধ এবং শেষে পটাশিয়াম ক্লোরাইড দেওয়া হতো। তবে সময়ের সঙ্গে এই পদ্ধতি ও ব্যবহৃত ওষুধের ধরন বদলেছে।
২০১০ সালের পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ওষুধ প্রস্তুতকারকদের ওপর মৃত্যুদণ্ডে তাদের তৈরি ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করার চাপ বাড়তে থাকে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন রিপ্রিভ এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রচারণা চালায়। পরে ইউরোপীয় দেশগুলো রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বড় ওষুধ কোম্পানিও মৃত্যুদণ্ডে তাদের পণ্য ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা দেয়।
ফলে অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য মৃত্যুদণ্ডের ওষুধ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।
তখন ভরসা করা হয় যৌগিক ওষুধ প্রস্তুতকারীদের ওপর
ওষুধের সংকট তৈরি হওয়ার পর কিছু অঙ্গরাজ্য যৌগিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা কম্পাউন্ডিং ফার্মেসির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত নির্দিষ্ট রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ তৈরি করে থাকে।
কিন্তু মৃত্যুদণ্ডে ব্যবহারের জন্য ওষুধ তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালায়েন্স ফর ফার্মেসি কম্পাউন্ডিং ২০১৫ সালে মৃত্যুদণ্ডের জন্য এ ধরনের ওষুধ তৈরি নিরুৎসাহিত করেছিল।
সমালোচকদের আশঙ্কা, সরবরাহকারীর গোপনীয়তা, ওষুধের উৎস, সংরক্ষণ, শক্তিমাত্রা এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকলে মৃত্যুদণ্ডের সময় গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকেরাও কেন দূরে থাকছেন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো চিকিৎসা পেশাজীবীদের বড় অংশের নৈতিক আপত্তি।
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্টভাবে বলেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে চিকিৎসকের অংশ নেওয়া উচিত নয়। সংগঠনটির নৈতিক নীতিমালা অনুযায়ী, জীবন রক্ষাকে পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে নেওয়া একজন চিকিৎসক আইনগতভাবে অনুমোদিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে অংশ নিতে পারেন না।
নার্সদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবস্থান রয়েছে। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দক্ষতা সরাসরি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞ করিনা ব্যারেট লেইনের মতে, এর ফলে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের বর্তমান ব্যবস্থা অনেকটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অসম্পূর্ণ সংস্করণে পরিণত হয়েছে—যেখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি প্রক্রিয়া এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে, যারা পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন।
শিরায় ওষুধ পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ
প্রাণঘাতী ইনজেকশন ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো সঠিকভাবে শিরায় প্রবেশ করতে না পারা।
টেনেসির টনি ক্যারুথার্সের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছিল। কর্মকর্তারা একটি শিরার পথ তৈরি করতে পারলেও দ্বিতীয় প্রয়োজনীয় পথ তৈরি করতে পারেননি। কেন্দ্রীয় শিরায় প্রবেশের চেষ্টাও সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় চেষ্টা করার পর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করতে হয়। ক্রিস্টা পাইকের ঘটনাতেও শিরায় ওষুধ পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তার ক্ষেত্রে ঠিক কী কারণে প্রাণঘাতী ইনজেকশন ব্যর্থ হলো, তা এখনো নিশ্চিত নয়। টেনেসির কারা কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা রাজ্যের অনুমোদিত প্রটোকল অনুসরণ করেছে।বিশেষজ্ঞদের সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মধ্যে রয়েছে—ওষুধ সঠিকভাবে শিরায় না গিয়ে শরীরের টিস্যুতে চলে যাওয়া, ওষুধের কার্যকারিতা বা শক্তিমাত্রার সমস্যা, কিংবা একই ওষুধের প্রতি মানুষের শারীরিক প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য।
পাইকের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন
পাইকের ঘটনাটি অন্য ব্যর্থতার তুলনায় আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ তিনি কেবল মৃত্যুবরণ না করেই বেঁচে যাননি; তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। এ কারণে মৃত্যুদণ্ডের উদ্দেশ্য, পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যর্থ প্রয়োগের পর বন্দির চিকিৎসা—সবকিছু নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি ২০২৬ সালের বাকি সময়ের জন্য অঙ্গরাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছেন এবং স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ৩ অক্টোবর টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনের কমিশনার ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডাও পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
বিকল্প পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে অঙ্গরাজ্যগুলো
প্রাণঘাতী ইনজেকশন নিয়ে সমস্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য বিকল্প মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেছে। আলাবামা ২০২৪ সালে নাইট্রোজেন হাইপোক্সিয়া বা নাইট্রোজেনের মাধ্যমে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু করে।
ফেডারেল পর্যায়েও বিকল্প পদ্ধতির আলোচনা জোরালো হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ফায়ারিং স্কোয়াড ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছে।
তবে নতুন পদ্ধতিগুলোও বিতর্কের বাইরে নয়। ফলে একদিকে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ওষুধ পাওয়া কঠিন হচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প পদ্ধতি নিয়েও মানবিকতা, আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন উঠছে।
‘মানবিক’ মৃত্যুদণ্ডের ধারণাই কি প্রশ্নের মুখে?
মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে শত বছরের বেশি সময় ধরে একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে—রাষ্ট্র এমন একটি পদ্ধতি খুঁজছে, যা একই সঙ্গে কার্যকর, নির্ভরযোগ্য এবং কম নির্মম।
কিন্তু একের পর এক ব্যর্থতা সেই দাবির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। শিরা খুঁজে না পাওয়া, ওষুধের সরবরাহ ও মান নিয়ে অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে অনীহা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় প্রশিক্ষিত কর্মীর ঘাটতি—সব মিলিয়ে প্রাণঘাতী ইনজেকশন আর আগের মতো সরল ও নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
অস্টিন সারাটের বক্তব্যের সারকথা হলো, উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতি খুঁজে আসছে, যা নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও মানবিক হবে। কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো পদ্ধতি এখনো পাওয়া যায়নি।
ক্রিস্টা পাইকের ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই আবার সামনে এনেছে—রাষ্ট্র যখন কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চায়, তখন সেই প্রক্রিয়া যদি ব্যর্থ হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক যন্ত্রণা তৈরি করে, সেটিকে কতটা ‘মানবিক’ বলা যায়? আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতি ও রাষ্ট্রের শাস্তি কার্যকরের দায়িত্বের সীমারেখা কোথায়—এই প্রশ্নও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।












