থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর চিয়াং মাইয়ের পাহাড়ঘেরা এক প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরে কয়েক দিন কাটিয়ে ধ্যানের মাধ্যমে নিজের অস্থির মনকে শান্ত করার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন এক ভ্রমণকারী। সেই যাত্রায় তিনি পরিচিত হয়েছেন তিন প্রজন্মের তিন ধ্যানগুরুর শিক্ষা ও জীবনদর্শনের সঙ্গে। কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান থাকলেও তাঁদের শিক্ষা যেন একই জায়গায় এসে মিশেছে—মনকে স্থির করা, অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ছেড়ে দেওয়া এবং বর্তমান মুহূর্তকে সচেতনভাবে অনুভব করা।
চিয়াং মাইয়ের দই সুথেপ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ওয়াট উমং সুয়ান বুদ্ধধাম্মা, যার অর্থ ‘বুদ্ধের শিক্ষার উদ্যান’, একটি প্রাচীন বনমঠ। ছয় হেক্টরেরও বেশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মন্দিরের পরিবেশ অন্য অনেক থাই মন্দিরের তুলনায় একেবারেই আলাদা। ঝলমলে স্থাপত্যের বদলে এখানে মন্দিরের ভবন, সন্ন্যাসীদের থাকার জায়গা ও অন্যান্য স্থাপনা ঘন জঙ্গলের সঙ্গে মিশে গেছে।

চিয়াং মাইয়ের ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার বর্তমান উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত সাতটি মন্দিরের একটি এই ওয়াট উমং। মন্দিরটির ইতিহাস, স্থাপত্য ও ধ্যানচর্চার ঐতিহ্য একে শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ নিদর্শনে পরিণত করেছে।
একটি কঠিন ও মানসিকভাবে চাপের সময়ের পর শান্তি খুঁজতে মন্দিরটিতে কয়েক দিন অবস্থান করেছিলেন ভ্রমণকারী। সেখানে তাঁর ধ্যানের শিক্ষক ছিলেন ফ্রা তাওয়াচাই। ২৬ বছর ধরে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করা এই শিক্ষক তাঁকে হাঁটার ধ্যানের একটি বিশেষ পদ্ধতি শেখান।
তিনি ধীরে ধীরে পা ফেলার ছয়টি ধাপ দেখিয়ে দেন—গোড়ালি তোলা, পা ওঠানো, সামনে নেওয়া, নামানো, মাটিতে স্পর্শ করানো এবং শেষে মাটিতে পা দৃঢ়ভাবে চাপ দেওয়া। শিক্ষককে অনুসরণ করে ভ্রমণকারীও একইভাবে ধীরগতিতে হাঁটতে থাকেন। প্রায় ২০ কদম এগিয়ে আবার গোড়ালির ওপর ভর করে ঘুরে একই পথে ফিরে আসতেন তাঁরা।
এই সহজ অনুশীলনের মধ্যেই ধীরে ধীরে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে। হাঁটার প্রতিটি মুহূর্ত ও নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মন রাখার মাধ্যমে অন্য চিন্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
বৌদ্ধ দর্শনে মনের স্বচ্ছতার পথে পাঁচটি বড় বাধার কথা বলা হয়—রাগ, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা, অলসতা এবং সন্দেহ। ধ্যানের সময় এসব অনুভূতি মনে এলে সেগুলোকে আঁকড়ে না ধরে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন ফ্রা তাওয়াচাই।
মনোযোগ যখন শ্বাস ও পায়ের চলাচলের ওপর স্থির হয়, তখন নিজের ভেতরে কী ধরনের চিন্তা বা অনুভূতি তৈরি হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হয়ে ওঠে। রাগ, অস্থিরতা কিংবা সন্দেহের মতো অনুভূতি দেখা দিলে সেগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনা হয় বর্তমান মুহূর্তে।
ধ্যানের পর মন্দির ঘুরে দেখতে গিয়ে ভ্রমণকারীর মনে হয়, ওয়াট উমং যেন নিজেই একটি জীবন্ত ধ্যানের স্থান। শ্যাওলা ধরা পথ, গাছপালায় ঘেরা ভবন এবং নীরব পরিবেশ পুরো জায়গাটিকে অন্যরকম আবহ দিয়েছে।
মন্দিরের কিছু গাছে ছোট ছোট বাক্য লেখা রয়েছে। এগুলোকে বলা হয় ‘কথা বলা গাছ’। সংক্ষিপ্ত এসব বাণীর মধ্যে মানুষের অহংকার, জ্ঞান, কাজ ও আত্মসংযম নিয়ে নানা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যেমন—নিজেকে যত বেশি জ্ঞানী মনে করা হয়, ততই নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ পেতে পারে। আবার শুধু অনেক কথা বলার চেয়ে সামান্য হলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মন্দিরের ‘স্পিরিচুয়াল থিয়েটার’-এ বৌদ্ধ দর্শন ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার নানা প্রতীকী চিত্র রয়েছে। দেয়ালে আঁকা এসব ছবির মাধ্যমে মানুষের আধ্যাত্মিক চর্চায় কী ধরনের বিভ্রান্তি ও বাধা তৈরি হতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রবেশপথের কিছু খোদাইয়ে কম্বোডিয়ার বিখ্যাত আংকর ওয়াট স্থাপত্যের প্রভাবও দেখা যায়।
মন্দিরের একটি খোলা প্রাঙ্গণে রয়েছে বহু ভাঙা বুদ্ধমূর্তি। কোনো মূর্তির মাথা নেই, কোনোটি হাতবিহীন, আবার কোনোটি শরীরের বিভিন্ন অংশ হারিয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত এসব মূর্তি শুধু পুরোনো স্থাপনার নিদর্শন নয়; বৌদ্ধ দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ‘অনিত্যতা’ বা সবকিছুর পরিবর্তনশীলতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
মন্দিরের একটি হ্রদের ছোট দ্বীপে রয়েছে থাই বৌদ্ধ চিন্তাবিদ বুদ্ধদাস ভিক্ষুর মূর্তি। ১৯০৬ সালে জন্ম নেওয়া এবং ১৯৯৩ সালে মৃত্যুবরণ করা বুদ্ধদাস ছিলেন আধুনিক থাইল্যান্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী বৌদ্ধ চিন্তাবিদদের একজন। তিনি দক্ষিণ থাইল্যান্ডের ওয়াট সুয়ান মোক্খকে কেন্দ্র করে কাজ করলেও ওয়াট উমংয়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
১৯৪৮ সালে বনজঙ্গলে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ওয়াট উমং পুনরুদ্ধারের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বুদ্ধদাস। তাঁর ধর্মদর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য বক্তব্য ছিল—যারা ধর্মের মৌলিক সত্য উপলব্ধি করেছেন, তাঁরা সব ধর্মের মধ্যেই একটি অভিন্ন সত্য দেখতে পাবেন।
এরপর ভ্রমণকারী এগিয়ে যান ওয়াট উমংয়ের সবচেয়ে পরিচিত অংশ—ধ্যানের সুড়ঙ্গগুলোর দিকে। কৃত্রিমভাবে তৈরি একটি উঁচু ঢিবির ভেতরে নির্মিত তিনটি সুড়ঙ্গের ওপর রয়েছে ঘণ্টার মতো আকৃতির একটি স্তূপ। এই সুড়ঙ্গগুলোর নাম থেকেই মন্দিরটি ‘টানেল টেম্পল’ নামে পরিচিত হয়েছে।
স্যান্ডেল খুলে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সুড়ঙ্গগুলোতে মৃদু আলো এবং দেয়ালের বিভিন্ন কুঠুরিতে বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। তিনটি সুড়ঙ্গের মধ্যে একটি পথ দিয়ে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। দর্শনার্থীরা সেখানে কিছু সময় বসেন, প্রার্থনা করেন কিংবা বুদ্ধমূর্তির সামনে নিবেদন রাখেন। তবে দর্শনার্থীদের নিয়মিত আসা-যাওয়ার কারণে জায়গাটি সবসময় গভীর ধ্যানের জন্য উপযোগী থাকে না।
এই সুড়ঙ্গকে ঘিরে রয়েছে বহু পুরোনো কিংবদন্তি। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়, চিয়াং মাই প্রতিষ্ঠার সময়, ১২৯৬ সালের কাছাকাছি রাজা মাংরাই এগুলো নির্মাণ করেছিলেন। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, ১৩৬৭ থেকে ১৩৮৫ সাল পর্যন্ত শাসন করা রাজা কুয়েনার সময় এগুলো তৈরি হয়।
তবে কিংবদন্তিগুলোর একটি সাধারণ অংশ হলো, সুড়ঙ্গগুলো তৈরি করা হয়েছিল থেরা চান নামের এক বিখ্যাত সন্ন্যাসীকে ঘিরে। তিনি ধ্যানের জন্য প্রায়ই জঙ্গলের গভীরে চলে যেতেন এবং দিনের পর দিন, কখনো সপ্তাহের পর সপ্তাহ সেখানে অবস্থান করতেন। ফলে প্রয়োজনের সময় রাজা তাঁকে খুঁজে পেতেন না।
থেরা চান সম্পর্কে আরও বলা হয়, তিনি ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানী এবং ধর্মীয় ও পার্থিব—দুই ধরনের বিষয়েই উচ্চপদস্থ সন্ন্যাসী, রাজপুত্র ও রাজাদের পরামর্শ দিতেন। তবে কিছু কিংবদন্তিতে তাঁর মানসিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁর একাকী ধ্যানের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতেই নাকি তৈরি করা হয়েছিল এই সুড়ঙ্গগুলো। জঙ্গলের নানা দৃশ্যের নকশায় সাজানো এসব সুড়ঙ্গ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ধ্যানের স্থান।
মন্দিরের আরও নির্জন অংশে রয়েছে মহাথেরা চান স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। সেখানে পৌঁছাতে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। চারপাশের নীরবতা, গাছপালা আর পুরোনো স্থাপনার আবহ ভ্রমণকারীর মনে কয়েক শতাব্দী আগের সেই ধ্যানগুরুর উপস্থিতির অনুভূতি তৈরি করে।
উঁচুতে উঠে দেখা যায়, ভুলে যাওয়া এক পুরোনো মন্দিরের ভিত্তি এবং জঙ্গলের নির্জন কোণে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যাওলা ধরা একটি অষ্টভুজাকৃতির স্তূপের অবশিষ্টাংশ। জায়গাটির নীরবতা যেন পুরো ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে একটি পূর্ণতা দেয়।
সেখানে দাঁড়িয়ে ভ্রমণকারী আবার হাঁটার ধ্যান শুরু করেন। মনে তখন নেই রাগ, সন্দেহ কিংবা অস্থিরতার মতো সেই পাঁচ বাধার অনুভূতি। ধীরে ধীরে পা ফেলার সময় তিনি মনে মনে উচ্চারণ করতে থাকেন—গোড়ালি তোলা, পা ওঠানো, সামনে নেওয়া, নামানো, স্পর্শ এবং মাটিতে চাপ দেওয়া।
ফ্রা তাওয়াচাইয়ের কাছ থেকে শেখা হাঁটার ধ্যান, বুদ্ধদাসের ধর্মদর্শন এবং বহু শতাব্দী আগে থেরা চান যে পথে ধ্যান করতেন—তিনটি আলাদা সময়ের তিনজন সাধকের শিক্ষা যেন একই জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, মন্দিরের অনেক কিছু ধ্বংস হয়েছে; কিন্তু মনকে শান্ত করার সেই পুরোনো অনুসন্ধান আজও একই রয়ে গেছে।
ওয়াট উমংয়ের অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রাচীন মন্দির দেখার ভ্রমণ নয়। এটি নিজের ভেতরের অস্থিরতা থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে বর্তমান মুহূর্তকে অনুভব করার একটি সুযোগ। ধ্যানের সেই ধীর পদক্ষেপই হয়তো মনে করিয়ে দেয়—শান্তি সবসময় বাইরে কোথাও খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়; অনেক সময় নিজের মনকে স্থির করার মধ্যেই তার শুরু।












