ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক সমতার প্রশ্নে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। তাঁর বক্তব্য, এমন কোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফলে যদি বিপুলসংখ্যক যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার হারান এবং নিজেদের দেশেই ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’-এর মতো অবস্থায় পড়েন, তাহলে তা সাংবিধানিক সমতার সঙ্গে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
রোববার হায়দরাবাদে ১৯তম নালসার-জাস্টিস বি আর সাওহনি মেমোরিয়াল মুট কোর্ট প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিচারপতি ভূঁইয়া এসআইআর নিয়ে চলমান আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সাংবিধানিক দিক তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের সময় ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া, যাচাইয়ের নোটিশ দেওয়ার ভিত্তি এবং আপিলের বড় জট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, শুধু নানা ধরনের যুক্তি দেখিয়ে এমন একটি পরিস্থিতিকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না, যার ফলে বিপুলসংখ্যক নাগরিক ভোটাধিকার হারান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের সংবিধান ভোটাধিকারসম্পন্ন নাগরিক এবং ভোটাধিকারবঞ্চিত নাগরিক, এমন দুটি শ্রেণির নাগরিকত্বের ধারণা সমর্থন করে না। তিনি এ ধরনের পরিস্থিতিকে সাংবিধানিক ব্যবস্থার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে বিচারপতির বক্তব্যকে বর্তমান এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল তাঁর একটি সাংবিধানিক বক্তব্য, যেখানে তিনি ভোটার বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
দিল্লিতে লাখ লাখ ভোটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন
এসআইআর নিয়ে দিল্লিতে বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় সামনে এসেছে। আদালতে আবেদনকারীরা জানিয়েছেন, ৩১ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৪৭.৫৬ লাখ নাম বাদ পড়েছে। আরও ৩৩.১৩ লাখ ভোটারকে ‘ম্যাপিং না থাকা’ অথবা ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র ভিত্তিতে নোটিশ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
২২ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনের কাছে এই প্রক্রিয়া নিয়ে জবাব চায়। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি জানতে চান, এসব নোটিশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হচ্ছে কি না। প্রধান বিচারপতিও ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তা স্পষ্ট করতে বলেন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন আদালতকে জানিয়েছে, নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হবে না। ফলে দিল্লির ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, কোন ভিত্তিতে একজন ভোটারের নাম বাদ বা যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতিকার পাওয়ার কী সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে আপিলের বিশাল জট
পশ্চিমবঙ্গেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পাশাপাশি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী২৭.১৬ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার পর ২২.২১ লাখ ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। একই সময়ে ভোটার তালিকায় অন্যদের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধেও ১৬.১০ লাখ আপিল জমা পড়ে। সব মিলিয়ে আপিলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮.৩১ লাখে।
এর মধ্যে ৩৭ লাখের বেশি আপিল তখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। এই বিপুল চাপ সামলাতে নির্বাচন কমিশন আপিল ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ১৯ থেকে বাড়িয়ে ৪২ করার প্রস্তাব দিয়েছে। বিষয়টি ৫ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে ওঠার কথা ছিল।
সর্বজনীন ভোটাধিকারকে সমতার ভিত্তি হিসেবে দেখলেন বিচারপতি
বিচারপতি ভূঁইয়া তাঁর বক্তব্যে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সংবিধান প্রণয়নের সময় সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাপক প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ও নিরক্ষরতার মতো বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও সংবিধান প্রণেতারা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয়কে সমান ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি এটিকে সাধারণ নাগরিকের ওপর আস্থা রাখার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, জাতপাত, সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানের বৈষম্যে বিভক্ত সমাজে রাজনৈতিক সমতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সর্বজনীন ভোটাধিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
‘এক ব্যক্তি, এক ভোট, প্রতিটি ভোটের সমান মূল্য’
সংবিধান সভায় বি আর আম্বেদকরের শেষ বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, ভারতের রাজনৈতিক সমতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে একটি বড় বৈপরীত্য ছিল। এই বাস্তবতার মধ্যেই ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট এবং এক ভোটের সমান মূল্য’ নীতি সাংবিধানিক সমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হয়ে ওঠে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন কোটিপতি ও একজন রিকশাচালকের ভোটের মূল্য সমান। একইভাবে সামাজিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত একজন মন্দিরের পুরোহিত এবং কঠিন শ্রমে নিয়োজিত একজন মানুষের ভোটও সমান মূল্য বহন করে। অর্থাৎ অর্থ, সামাজিক মর্যাদা বা পেশার ভিত্তিতে নাগরিকের ভোটের মূল্য আলাদা হওয়ার কথা নয়।
সংবিধানের ৩২৫ ও ৩২৬ অনুচ্ছেদ
ভোটার তালিকা ও ভোটাধিকারের সাংবিধানিক কাঠামো ব্যাখ্যা করতে বিচারপতি ভূঁইয়া সংবিধানের ৩২৫ ও ৩২৬ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করেন।
৩২৫ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য একটি সাধারণ ভোটার তালিকার ব্যবস্থা এবং শুধু ধর্ম, বর্ণ, জাত বা লিঙ্গের কারণে কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার নীতি রয়েছে। অন্যদিকে ৩২৬ অনুচ্ছেদ লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তি নির্ধারণ করে, যদিও সংবিধান ও আইনে স্বীকৃত কিছু অযোগ্যতার বিষয় রয়েছে।
বিচারপতি ভূঁইয়া তাঁর বক্তব্যে ‘ভারতের প্রত্যেক নাগরিক’-এর বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত কোনো অযোগ্যতা প্রযোজ্য না হলে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের অধিকার রয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বক্তব্যকে এমন অর্থে নেওয়া উচিত নয় যে ভারতের প্রত্যেক নাগরিক কোনো অতিরিক্ত শর্ত ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার হয়ে যান। ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া প্রযোজ্য।
ভোটাধিকার নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও আইনি সীমা আছে: বিচারপতির বক্তব্য
বিচারপতি ভূঁইয়া ভারত সরকারের বিরুদ্ধে পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজের মামলা এবং অনুপ বরনওয়ালের মামলার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটাধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত না হলেও সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে এর সাংবিধানিক গুরুত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে।
তিনি আরও যুক্তি দেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় ভোটারদের অধিকার প্রভাবিত করে এমন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার বাইরে থাকতে পারে না।
তবে এটিকে এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। বরং বিচারপতি ভূঁইয়া তাঁর বক্তব্যে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও যুক্তিসংগততা, ন্যায্যতা ও সাংবিধানিক নীতির গুরুত্বের কথা বলেছেন।
নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নোটিশ ও শুনানির গুরুত্ব
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গে বিচারপতি ভূঁইয়া ১৯৯৫ সালের লাল বাবু হুসেইন মামলার কথা উল্লেখ করেন।
এই মামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মৃত ভোটারের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ভোটার তালিকায় থাকা কোনো ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ ও শুনানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধন বা নাম বাদ দেওয়ার মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য জানানোর এবং প্রযোজ্য আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এটিকে এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম হিসেবে দেখা উচিত নয় যে কোনো পরিস্থিতিতেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া যাবে না।
ভোটাধিকারকে নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, নাগরিকের পরিচয় থেকে ভোটাধিকারকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এ প্রসঙ্গে তিনি ভোটাধিকার হারানোর বিষয়টিকে শরীর থেকে আত্মা বের করে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।
‘কেউ সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়’
বক্তব্যের শেষ দিকে বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদের মূল নীতিকে এমনভাবে পরিবর্তন বা সীমিত করা উচিত নয়, যাতে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো কর্তৃপক্ষ সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয় এবং সাংবিধানিক নীতিকে উপেক্ষা করার সুযোগ কারও নেই।
তিনি সাংবিধানিক আইনজীবী নানি পালখিভালার একটি সতর্কবার্তার কথাও স্মরণ করেন, স্বাধীনতা রক্তের ধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না; প্রতিটি প্রজন্মকে তা রক্ষা করতে হয়।
সবশেষে বিচারপতি ভূঁইয়া প্রশ্ন তোলেনভোটাধিকার ছাড়া একজন নাগরিকের নাগরিকত্বের মূল্যই বা কতটুকু?
এসআইআর নিয়ে ভারতের আদালত ও নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের প্রক্রিয়ায় একদিকে প্রকৃত ভোটারদের তালিকা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে যোগ্য নাগরিক যাতে অযথা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেই ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে। বিচারপতি ভূঁইয়ার বক্তব্য সেই সাংবিধানিক প্রশ্নকেই সামনে এনেছে।












