ইয়েমেনের সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দেশটির ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকা পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে। রোববার প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) প্রধান রাশাদ আল-আলিমি টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে এ অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন।
আল-আলিমি বলেন, দেশকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত সরকারি বাহিনীর অভিযান চলবে। পরে ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্রও হুতিদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান।
২০১৪ সাল থেকে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। জনসংখ্যার বড় অংশ এই অঞ্চলে বসবাস করে। গত কয়েক বছরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থিত বিভিন্ন সামরিক অভিযানের পরও হুতিদের পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। ইরানের সহায়তায় তারা নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাও বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
বাব আল-মান্দাব দখলে হুতিদের বড় অগ্রগতি
গত মাসে হুতিরা আকস্মিক অভিযান চালিয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অগ্রগতি তাদের আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর নতুন ধরনের প্রভাব তৈরি করেছে।
বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। এই জলপথ দিয়ে ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। চলতি বছরে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে এই নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ইয়েমেনের সাম্প্রতিক সংঘাত তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরবে হামলার দাবি হুতিদের
ইয়েমেনি সরকারের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণার পর হুতিরা দাবি করে, তারা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং খুরাইস এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
হুতিদের দাবি, এসব হামলায় বড় ধরনের আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ইয়েমেনে গত ১২ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী প্রায় ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, এর জবাব হিসেবেই তারা সৌদিতে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে হুতিরা।
তবে সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে হুতিদের এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
আল-আলিমি বলেন, সংঘাত কমানোর সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়ার পরই পাল্টা সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি সৌদি আরবের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং ইয়েমেনের মিত্র দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের পিএলসি বাহিনী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
এর আগে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সৌদি আরব এবং তাদের সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌদি বাহিনী আকাশপথে হামলা চালাবে এবং ইয়েমেনি বাহিনী স্থলভাগে অভিযান পরিচালনা করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সৌদি আরবের ইয়েমেন অভিযানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশও সৌদি আরবকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতে বিভিন্ন স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক পক্ষ রয়েছে, যাদের পেছনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন রয়েছে। ফলে দেশটির সংঘাত একদিকে গৃহযুদ্ধ, অন্যদিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় ইয়েমেনে গণআন্দোলন শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। পরবর্তী সময়ে জাইদি শিয়া মুসলিমদের সশস্ত্র সংগঠন হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে।
সৌদি-সমর্থিত পিএলসি, যেটিকে জাতিসংঘও ইয়েমেনের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, হুতিদের দখলের পর থেকে মূলত দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। তাদের প্রধান ঘাঁটি দক্ষিণ ইয়েমেনের সাবেক রাজধানী এডেন।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আরব জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে এবং পিএলসিকে সমর্থন দেয়। কিন্তু দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরও হুতিদের পরাজিত করা যায়নি।
২০২২ সালে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যত বেশ কিছুদিন ধরে টিকে ছিল। তবে চলতি বছর ইরানকে ঘিরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হুতিরা সৌদি নৌযান ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করলে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়।
তায়েজে হুতিদের চাপ বাড়ছে
গত মাসে বাব আল-মান্দাব দখলের আকস্মিক অভিযানের পর থেকে স্থলযুদ্ধেও হুতিরাই এগিয়ে রয়েছে। সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে দিয়ে তারা দ্রুত বিভিন্ন এলাকা দখলে নেয়।
গত ৪৮ ঘণ্টায় তায়েজের কাছে কৌশলগত কয়েকটি পাহাড়ি অবস্থানেও হুতিরা অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে সামরিক সূত্র জানিয়েছে। এসব অবস্থান সরকারি ও স্থানীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তায়েজ থেকে দক্ষিণ উপকূলের এডেনের দিকে যাওয়ার শেষ গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিও এখন হুতিদের অগ্রযাত্রার মুখে। সড়কটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে গেলে তায়েজ শহর কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
তায়েজ ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এখানে কয়েক লাখ বেসামরিক মানুষ বসবাস করেন এবং হাজার হাজার সরকারি সেনাও অবস্থান করছে। ফলে শহরটির ওপর অবরোধ তৈরি হলে সামরিক সংকটের পাশাপাশি মানবিক পরিস্থিতিও আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
তায়েজের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। পিএলসি প্রধান আল-আলিমি এই অঞ্চলের বাসিন্দা। ফলে শহরটি অবরুদ্ধ হলে ইয়েমেনের সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা
নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাবে ইয়েমেনের কিছু এলাকায় প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে প্রায় তিনটি পরিবার খাদ্যসংকটে পড়েছে।
নতুন করে লড়াইয়ে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত আরও তীব্র হলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। লোহিত সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে ইয়েমেনের নতুন সামরিক অভিযান এখন একই সঙ্গে তিনটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে, হুতিদের কাছ থেকে ভূখণ্ড পুনর্দখলে সরকারি বাহিনী কতটা সফল হবে, বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত কতটা বিস্তৃত হবে এবং নতুন লড়াইয়ে ইতোমধ্যে ভয়াবহ মানবিক সংকটে থাকা ইয়েমেনের পরিস্থিতি কতটা অবনতি ঘটবে।












