পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে আবারও বড় ধরনের জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। ডেরা ইসমাইল খান জেলায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে আটজন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্র। নিহতদের মধ্যে তিনজনকে গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার হিসেবে শনাক্ত করার কথাও জানিয়েছে তারা।
রোববারের এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং বিদেশি মুদ্রা উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়, তাদের সাংগঠনিক ভূমিকা এবং ভারতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে তাদের কথিত যোগাযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রই তাদের ‘ভারত-সমর্থিত’ এবং ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’ সদস্য হিসেবে বর্ণনা করেছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান
নিরাপত্তা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেরা ইসমাইল খানের সংশ্লিষ্ট এলাকায় সশস্ত্র ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর অভিযানটি চালানো হয়। অভিযানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে জঙ্গিদের সংঘর্ষ হয় এবং এতে আটজন নিহত হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে তিনজনকে গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার বলা হয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। বিদেশি মুদ্রা উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে নিরাপত্তা সূত্র।
তবে এ ধরনের অভিযানের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দেওয়া হতাহতের সংখ্যা ও নিহতদের পরিচয় অনেক সময় স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অভিযানে ঠিক কতজন নিহত হয়েছে এবং নিহতদের সাংগঠনিক পরিচয় কী ছিল, সে বিষয়ে আরও স্বাধীন তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
এক দিনের ব্যবধানে আরও ১১ জন নিহতের দাবি
ডেরা ইসমাইল খানের এই অভিযানের মাত্র এক দিন আগে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে পৃথক অভিযানে আরও ১১ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করেছিল পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী।
ওই অভিযানগুলোর একটি চালানো হয় খাইবার পাখতুনখোয়ার দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে। অন্যটি হয় বেলুচিস্তানের গোরিনদার-মাশকেল এলাকায়। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, দেশজুড়ে চলমান জঙ্গিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবেই এসব তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তানের দুই অস্থির প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মাত্রা আরও বেড়েছে। এর পেছনে দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে সশস্ত্র হামলা বৃদ্ধির বিষয়টি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হামলা সেপ্টেম্বরে
পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, তার একটি বড় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানে।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ—পিআইসিএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে ২২৫টি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ১৯৯। অর্থাৎ এক মাসে হামলা বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের সংখ্যা গত ১২ বছরের মধ্যে কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য উদ্ধৃত করে একাধিক প্রতিবেদন জানিয়েছে।
পিআইসিএসএসের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে হামলার পাশাপাশি জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপহরণের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই মাসে ৭২ জন অপহৃত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যা এক দশকের মধ্যে মাসিক সর্বোচ্চ বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

বেলুচিস্তান ছিল সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অঞ্চল। সেপ্টেম্বরে সেখানে ১৩১টি সশস্ত্র হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়াতেও হামলার সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের অভিযোগ
পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্কও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের মাটিতে অবস্থান করা কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তানের ভেতরে হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ভূমিকা রাখছে।
পাকিস্তানের দাবি, আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষ এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বিশেষ করে পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপির সদস্যদের আফগান ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় থাকার অভিযোগ বারবার তুলেছে ইসলামাবাদ।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কাবুলের অবস্থান হলো, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যার দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপানো উচিত নয়।
এই পারস্পরিক অভিযোগের কারণে দুই দেশের সম্পর্কেও দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা অভিযান, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সীমান্তে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কেন খাইবার পাখতুনখোয়া এত গুরুত্বপূর্ণ?
আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অঞ্চল। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তার কারণে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
ডেরা ইসমাইল খানও এই নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অতীতেও এই অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ফলে সেখানে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পাকিস্তানি নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। লক্ষ্য হচ্ছে বড় ধরনের হামলার আগে সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের শনাক্ত করা এবং তাদের সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।

শুধু অভিযানেই কি কমবে হামলা?
নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান জঙ্গি নেটওয়ার্কের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার নিহত হলে একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো সাময়িকভাবে দুর্বল হতে পারে।
কিন্তু পাকিস্তানে হামলার সংখ্যা বাড়তে থাকায় বোঝা যাচ্ছে, শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান করা কঠিন হতে পারে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সেপ্টেম্বরে ২২৫টি হামলার ঘটনা এবং পরপর কয়েকটি অভিযানে বহু জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি—দুটি বিষয় একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে। একদিকে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সশস্ত্র হামলার প্রবণতাও কমছে না।
সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ
ডেরা ইসমাইল খানে আটজন নিহত হওয়ার সর্বশেষ দাবি তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অভিযান হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর সঙ্গে পাকিস্তানের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির যোগসূত্র রয়েছে।
বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে হামলার চাপ অব্যাহত থাকলে ইসলামাবাদের জন্য একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে সর্বশেষ অভিযানে নিহতদের পরিচয়, তাদের কথিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভারতীয় সমর্থনের অভিযোগ—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রের দাবিকে দাবি হিসেবেই দেখা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আফগান ভূখণ্ড থেকে হামলা পরিচালনার অভিযোগ নিয়েও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হওয়ায় বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।












