বয়স এখনও ২০ পেরোয়নি। কারও বয়স ১৬, কারও ১৮ বা ১৯। কেউ এখনও স্কুলে পড়ছে, কেউ এরই মধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্স শহরের কিছু কিশোর-তরুণ জড়িয়ে পড়েছে এমন এক অবৈধ ব্যবসায়, যার গন্তব্য মেক্সিকোর শক্তিশালী মাদকচক্র।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ফিনিক্স ও আশপাশের এলাকার কিছু কিশোর-তরুণ আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে তা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মেক্সিকান মাদকচক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করছে। এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ পরে মেক্সিকোয় পৌঁছায়।
প্রতিবেদনটিতে ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী চার তরুণের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, অর্থ উপার্জন, সামাজিক মর্যাদা এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের এই অপরাধজগতের দিকে টেনে নিয়েছে। তাদের কেউ কেউ নিজেদের কার্যক্রমকে মূলত ব্যবসা হিসেবেই দেখছে।
মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৫ লাখ আগ্নেয়াস্ত্র অবৈধভাবে মেক্সিকোয় প্রবেশ করতে পারে। এসব অস্ত্র দেশটির মাদকচক্রগুলোর সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্রুত অর্থের লোভে কিশোররা
যুক্তরাষ্ট্রের মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র পাচারবিরোধী কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোতে কিশোরদের ব্যবহার করে অস্ত্র পাচারের প্রবণতা বাড়ছে। অ্যারিজোনার মেক্সিকো সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মাদকচক্রের যোগাযোগ এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ—সব মিলিয়ে এই ধরনের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে।
অ্যালকোহল, টোব্যাকো, ফায়ারআর্মস অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভসের ফিনিক্স বিভাগের কর্মকর্তা এ জে গিবস বলেন, তরুণদের কাছে দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ অনেক সময় অন্য অপরাধের মতোই আকর্ষণ তৈরি করে। অপরাধী গোষ্ঠীগুলো এমন তরুণদের খুঁজে নেয়, যাদের সহজে প্রভাবিত করা যায়।
২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বয়স শনাক্ত করা ১১ হাজারের বেশি অস্ত্র পাচার-সংক্রান্ত তদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অভিযুক্তের বয়স ২৫ বছরের নিচে। প্রায় ৫ শতাংশের বয়স ছিল ১৭ বছরেরও কম। তবে এসব তদন্তের মধ্যে কতজন মেক্সিকোয় অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
স্কুল থেকে অপরাধজগত
প্রতিবেদনটিতে ‘জে এম’ নামে পরিচিত এক তরুণের কথা বলা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর আগে স্কুলের একটি বাথরুমে কয়েকজন বন্ধু মিলে তারা প্রথম অস্ত্র কেনাবেচার পরিকল্পনা করে। অল্প অর্থ জোগাড় করে একটি অস্ত্র কেনার পর সেটি বিক্রি করে তারা লাভ করে। এরপর সেই লাভ দিয়ে আরও অস্ত্র কেনাবেচায় জড়িয়ে পড়ে।

এখন ১৮ বছর বয়সী জে এম দাবি করেছে, ফিনিক্সের অন্তত ২০টি উচ্চবিদ্যালয়ের কয়েক ডজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। তার দাবি, তাদের সংগ্রহ করা অস্ত্রের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মেক্সিকান মাদকচক্রের প্রতিনিধিদের হাতে যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, মাদকচক্রগুলো কিশোরদের ব্যবহার করতে আগ্রহী হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। তাদের অনেকের আগের কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকে না এবং গ্রেপ্তার হলে তুলনামূলকভাবে কম শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি সহজে অর্থ উপার্জনের প্রতিশ্রুতিও তাদের আকৃষ্ট করে।
অস্ত্রকে ‘ব্যবসা’ হিসেবে দেখছে তারা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কিশোরের কথাবার্তায় অস্ত্র কেনাবেচা অনেকটা সাধারণ ব্যবসার মতোই উঠে আসে। তারা লাভ, সরবরাহকারী এবং ক্রেতা নিয়ে আলোচনা করে। অস্ত্রের প্রতি তাদের আগ্রহ অনেক সময় পোশাক, গাড়ি বা অন্য ভোগ্যপণ্যের প্রতি আগ্রহের মতোই হয়ে উঠেছে।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ জানিয়েছে, অর্থের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দামি উপহার, পোশাক কিংবা বিলাসী জীবনযাপন তাদের কাছে এই অবৈধ আয়ের দৃশ্যমান ফল হিসেবে দেখা দেয়।
‘এল ফ্লাকো’ নামে পরিচিত ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ বলেছে, অস্ত্র কেনাবেচা থেকে খারাপ মাসেও সে কয়েক হাজার ডলার আয় করতে পারে। এই অর্থই তাকে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আটকে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন ঝুঁকি
অস্ত্র পাচারের এই নেটওয়ার্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের মতো অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, গত পাঁচ থেকে দশ বছরে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার অস্ত্র কেনাবেচার নেটওয়ার্ককে আরও দ্রুত বিস্তৃত হতে সাহায্য করেছে।
ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক মেটা জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে অস্ত্র কেনাবেচা নিষিদ্ধ। তবে প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অপরাধী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্নভাবে এসব নিয়ম এড়িয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছে। মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের কার্যক্রম শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বৈধ অনুরোধে সাড়া দেওয়া হয়।
মাদকচক্রের জন্য কিশোররা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাবেক মার্কিন তদন্ত কর্মকর্তা জেসন রেডের মতে, তিনি অ্যারিজোনায় যে অস্ত্র পাচারের বহুসদস্যের মামলাগুলো তদন্ত করেছিলেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই অন্তত একজন কিশোরের সম্পৃক্ততা ছিল।
তার মতে, মাদকচক্রগুলো কিশোরদের সহজে ব্যবহার করতে পারে এবং তাদের অনেকেই নিজেদের কাজের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে খুব বেশি ভাবে না। ফলে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে তারা এক ধরনের সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য মাধ্যম হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, এসব কিশোরের অনেকেই সীমান্তের ওপারে অস্ত্র যাওয়ার পর সেগুলো কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়ে খুব একটা ভাবতে চায় না। তাদের কাছে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় অর্থ উপার্জন।
এতে শুধু মেক্সিকোর অপরাধজগত নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর কিশোরদের মধ্যেও অপরাধের একটি নতুন চক্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অস্ত্রের অবৈধ প্রবাহে বাড়ছে সহিংসতা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোয় বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকচক্রের সংঘাত আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সিনালোয়া মাদকচক্রকে ঘিরে সংঘাত এবং মেক্সিকো সরকারের চলমান দমন অভিযান—দুইয়ের মাঝখানে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক সহজলভ্য অস্ত্র এবং সীমান্তবর্তী কিছু অঙ্গরাজ্যের আইনগত কাঠামো অবৈধ সরবরাহের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তের দুই পাশে সক্রিয় অপরাধী নেটওয়ার্ক।
ফলে একটি অস্ত্র শুধু একজন কিশোরের দ্রুত অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হয়ে থাকছে না; সেটি শেষ পর্যন্ত মাদকচক্রের সহিংসতা, সংঘাত ও প্রাণহানির অংশ হয়ে উঠছে।
কিশোরদের সামনে ভয়াবহ ভবিষ্যৎ
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই তরুণদের অনেকেই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়াকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে দেখছে না। বরং দ্রুত পাওয়া অর্থ ও সামাজিক পরিচিতি তাদের কাছে বড় হয়ে উঠছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ছে। অস্ত্র পাচারের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে তদন্তকারীরা প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিও ব্যবহার করছেন। অপরাধীরা যত বেশি ডিজিটাল যোগাযোগের ওপর নির্ভর করছে, তদন্তকারীরাও তত বেশি এসব নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।

প্রতিবেদনে উঠে আসা এক তরুণ শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর সিনালোয়া অঙ্গরাজ্যে আত্মগোপন করে। তার ধারণা ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু সেখানেও তার বক্তব্য ছিল—পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সে আবার ফিরে এসে এই ‘ব্যবসা’ চালিয়ে যাবে।
এই মানসিকতাই দেখিয়ে দেয়, কেবল অস্ত্র জব্দ বা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তরুণদের অপরাধে টেনে নেওয়া অর্থনৈতিক প্রলোভন, সামাজিক পরিবেশ, অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং সীমান্তপারের অপরাধী নেটওয়ার্ক—সবকিছুকেই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
কারণ আজ যে কিশোর কয়েক হাজার ডলারের আশায় অস্ত্র বিক্রি করছে, আগামী দিনে তার হাতেই আরও বড় অপরাধী নেটওয়ার্কের দায়িত্ব চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।












