ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। এক পক্ষ দ্রুত সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে থাকলেও অন্যরা সম্ভাব্য ফলাফল, অস্ত্রের মজুত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়েছিল। পরে হুতিদের বিরুদ্ধে ৫১ দিনের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ এবং ইরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর যুদ্ধ সেই পুরোনো দ্বন্দ্বের বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে।
পেন্টাগনে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধ
২০২৫ সালের শুরুর দিকে লোহিত সাগরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সামরিক বিকল্প দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা জেনারেল মাইকেল ‘এরিক’ কুরিলা হুতিদের পাশাপাশি তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানের বিরুদ্ধেও সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে ছিলেন।
অন্যদিকে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল চার্লস কিউ. ব্রাউন জুনিয়র আরও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করেই প্রেসিডেন্টকে বিকল্প দেওয়া উচিত।
সেই বৈঠকেই কুরিলা বলেন, ‘মূল্যায়নের সময় শেষ।’ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও কুরিলার অবস্থানকে সমর্থন করেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হুতিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী অভিযান চালালে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে—বৈঠকগুলোতে এমন উদ্বেগও উঠে আসে। পরে ইরানের বিরুদ্ধে সাত মাসের যুদ্ধে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নির্দিষ্ট অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ শুরু করেন। ৫১ দিনের ওই অভিযানে এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। হুতিদের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার, অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক স্থাপনাও হামলার আওতায় আসে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে এতে উল্লেখযোগ্য বেসামরিক হতাহতও হয়।
অভিযান নিয়ে প্রশ্ন, তারপর আকস্মিক যুদ্ধবিরতি
ট্রাম্প ও হেগসেথ অভিযানটিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও পেন্টাগনের কয়েকজন কর্মকর্তা এর লক্ষ্য কতটা স্পষ্ট ও অর্জনযোগ্য ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। একপর্যায়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রশাসন অভিযান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করে।
২০২৫ সালের মে মাসে ওমানের মধ্যস্থতায় হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, হুতিরা আর মার্কিন জাহাজে হামলা করবে না। তবে অভিযানের সময় অন্তত সাতটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত হয় এবং সমুদ্র দুর্ঘটনায় দুটি এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান হারায় যুক্তরাষ্ট্র। কোনো মার্কিন সেনা নিহত না হলেও অভিযানের ব্যয় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘দ্রুত জয়’ নাকি কৌশলগত সাফল্য?
ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার রাফ রাইডারের পক্ষে থাকলেও যুদ্ধবিরতিতে তারা বিস্মিত হয়। এক ইয়েমেনি কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন পরিস্থিতিকে কৌশলগতভাবে দেখেনি; বরং দ্রুত একটি জয় চেয়েছিল। তার দাবি, যুদ্ধবিরতির পর হুতিরা অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিরা আবার সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র সৌদি আরবও হুতিদের মোকাবিলায় নতুন অংশীদারের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে পুরোনো দ্বন্দ্বের যোগসূত্র
হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা থামেনি। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের যুদ্ধ শুরু করে ওয়াশিংটন।
প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে, হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগে পেন্টাগনে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল—অভিযানের লক্ষ্য কতটা স্পষ্ট, সামরিক শক্তি কতটা ব্যবহার করা যাবে এবং যুদ্ধ কতটা দীর্ঘায়িত হতে পারে—সেগুলো পরবর্তী ইরান যুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনবিষয়ক সাবেক মার্কিন দূত টিম লেন্ডারকিংয়ের মতে, গাজা যুদ্ধের পর হুতিরা আরব বিশ্বে নিজেদের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অন্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, হুতিরা দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে থেকে যাবে।
এক ইয়েমেনি কর্মকর্তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি হুতিদের গুরুত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়, তাহলে আগের অভিজ্ঞতা থেকেই আবার মূল্য দিতে হতে পারে। ওয়াশিংটন হয়তো হুতিদের সঙ্গে সংঘাত থেকে সরে যেতে চায়, কিন্তু হুতিরা যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সংঘাত শেষ করেছে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ইয়েমেন, হুতি ও ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি
লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতিদের অবস্থান, ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের ঘোষিত অবস্থান—সব মিলিয়ে ইয়েমেন এখনো মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতির একটি জটিল অধ্যায়। রাফ রাইডারের আকস্মিক সমাপ্তি এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সেই জটিলতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
পেন্টাগনের ভেতরের পুরোনো মতবিরোধ তাই শুধু একটি সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ ছিল না; তা যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এবং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনেছিল।












