ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক পথে গেলে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী জবাব দেবে তেহরান। তবে একই সঙ্গে ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানে পৌঁছাতে কূটনীতির দরজাও খোলা রেখেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক সংঘাতের পথ বেছে নিলে আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসানে ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের জন্য তারা এখনো প্রস্তুত। রোববার তেহরানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে এ অবস্থান তুলে ধরেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
সামরিক প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি—দুই পথেই প্রস্তুত
আরাগচি বলেন, ইরান একই সঙ্গে আত্মরক্ষা এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে দৃঢ় ও প্রস্তুত অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার সামরিক সংঘাতের পথ নেয়, তাহলে ইরান আগের চেয়ে শক্তিশালীভাবে নিজেদের রক্ষা করবে এবং আরও কঠোর জবাব দেবে।
তবে ওয়াশিংটন যদি কূটনৈতিক পথ বেছে নেয়, তেহরানও যুদ্ধের অবসানে একটি ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানে পৌঁছাতে আলোচনায় প্রস্তুত। আরাগচির ভাষায়, সামরিক শক্তি বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়; কার্যকর সমাধান হতে পারে কেবল ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে।
নিউইয়র্কে কূটনৈতিক তৎপরতার দাবি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতার কথাও তুলে ধরেন আরাগচি। তিনি জানান, ইরানের প্রতিনিধি দল ৪২ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ১০ জন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
তার দাবি, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এসব বৈঠকে ইরান নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার যে প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহল চালিয়েছে বলে তেহরান মনে করে, এসব কূটনৈতিক যোগাযোগ তা ব্যর্থ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরাগচি বলেন, নিউইয়র্কে ইরানকে একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত দেশ হিসেবে দেখা গেছে এবং দেশটি যুদ্ধ ও শান্তি—দুই ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান ও প্রস্তাব তুলে ধরেছে।
হরমুজ নিয়ে সাত দিনের পরিকল্পনা
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়েও ইরানের একটি নির্দিষ্ট কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা জানান আরাগচি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ মেটানো এবং চলমান যুদ্ধের অবসানে তেহরান একটি ‘সাত দিনের পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে সাত দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রণালি খোলার ক্ষেত্রে ইরানের যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণ করা প্রয়োজনীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইউরোপের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন আরাগচি। তিনি বলেন, ইউরোপের সঙ্গে তার আলোচনা ছিল বিস্তৃত ও খোলামেলা। ইরান আশা করে, ইউরোপীয় দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও নীতি নতুন করে বিবেচনা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। আরাগচির দাবি, ন্যাটোর মহাসচিব ইউরোপে থাকা ঘাঁটি থেকে পাঁচ হাজারের বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানে হামলার জন্য উড্ডয়নের কথা জানিয়েছেন। এ কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে তিনি জানতে চান, তারা কেন এই যুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছিল।
একই সঙ্গে ইউরোপকে তেহরানের সঙ্গে সংলাপে বসার এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন কোনো সংঘাতমুখী উদ্যোগে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আরাগচি আরও বলেন, ইরানের প্রতিনিধি দলকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল—এমন মার্কিন দাবিও তেহরান প্রত্যাখ্যান করছে। তার ভাষ্য, প্রতিনিধি দল পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল এবং সেভাবেই ফিরে এসেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে—নতুন সামরিক হামলা হলে কঠোর প্রতিরোধ এবং সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য প্রস্তুতি। তেহরানের প্রস্তাবিত সাত দিনের পরিকল্পনা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার উদ্যোগ এখন সেই কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক হামলা চালালে আগের চেয়ে শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাত দিনের পরিকল্পনা মেনে চললে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।












