ভারতে সয়াবিন আমদানিকে ঘিরে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আফ্রিকার দেশ নাইজার থেকে সয়াবিন আমদানির ঘোষণা দিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা নেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এসব পণ্য প্রতিবেশী নাইজেরিয়া থেকে এসেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ভারতের শুল্ক কর্তৃপক্ষ।
রয়টার্সের পাওয়া সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ভারতে নাইজার থেকে সয়াবিন আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অথচ নাইজারে সয়াবিন উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত। এ কারণে আমদানির ঘোষিত উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে মোট সয়াবিন আমদানি হয়েছে ৯ লাখ ৯ হাজার ৬০৬ টন। এক বছর আগে একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৯৯৬ টন।
এর মধ্যে নাইজার থেকে এসেছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৮ টন সয়াবিন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে নাইজার থেকে এমন কোনো আমদানির তথ্য ছিল না।

নাইজারে উৎপাদন খুবই কম
ভারতের শুল্ক কর্তৃপক্ষের সন্দেহের মূল কারণ এখানেই। নাইজার বছরে ১০০ টনেরও কম সয়াবিন উৎপাদন করে বলে আফ্রিকার সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিভিন্ন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কয়েক লাখ টন সয়াবিন নাইজার থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভারতের শুল্ক বিভাগ আমদানিকারকদের পাঠানো নোটিশে জানিয়েছে, নাইজারে সয়াবিন উৎপাদনের পরিমাণ খুবই কম। সে তুলনায় আমদানির পরিমাণ দেশটির স্বাভাবিক উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে বলে তাদের ধারণা।
এই পরিস্থিতিতে শুল্ক কর্মকর্তারা জানতে চাইছেন, নাইজার থেকে এসেছে বলে ঘোষণা করা সয়াবিনের প্রকৃত উৎস কোথায়।
নাইজেরিয়ার দিকে নজর
ভারতের তদন্তে প্রতিবেশী নাইজেরিয়ার নামও সামনে এসেছে। আফ্রিকার অন্যতম প্রধান সয়াবিন উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ নাইজেরিয়া। বৈশ্বিক বাজারে দেশটির অবস্থান খুব শীর্ষে না হলেও আফ্রিকা মহাদেশে সয়াবিন উৎপাদনে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ।
নাইজার স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ায় সেখান থেকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী নাইজেরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করা সম্ভব। তাই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এখন আমদানিকৃত সয়াবিনের পরিবহনপথ ও নথিপত্রও পরীক্ষা করছে।
তদন্তে আমদানিকারকদের কাছে নাইজার থেকে পণ্য পরিবহনের অভ্যন্তরীণ রেকর্ড, ট্রানজিট পারমিট এবং অন্যান্য পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

শুল্কমুক্ত সুবিধাই কি মূল কারণ?
ভারতে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত কয়েকটি দেশ থেকে নির্দিষ্ট পণ্য শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ রয়েছে। নাইজারও এই সুবিধার আওতাভুক্ত। ফলে নাইজার থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে প্রমাণিত হলে সয়াবিন আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় না।
অন্যদিকে, পণ্যগুলো যদি প্রকৃতপক্ষে নাইজেরিয়া থেকে আসে এবং নাইজারের নামে আমদানি দেখানো হয়ে থাকে, তাহলে আমদানিকারকদের ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক দিতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ কারণেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এখন আমদানির কাগজপত্রের পাশাপাশি পণ্যের প্রকৃত উৎস যাচাই করছে।
কাগজপত্রে নাইজার, পণ্য কোথা থেকে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় বন্দরগুলোতে চালান ছাড় করার সময় আমদানিকারকেরা নাইজারের কর্তৃপক্ষের দেওয়া উৎপত্তি সনদ ও উদ্ভিদস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সনদ জমা দিয়েছিলেন। এসব নথির ভিত্তিতেই আগে চালানগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধায় ছাড় করা হয়।
তবে বিপুল পরিমাণ সয়াবিনের ঘোষিত উৎস এবং নাইজারের বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
ভারতের শুল্ক কর্তৃপক্ষ এখন আমদানিকারকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে চালানগুলোর প্রকৃত উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আমদানিকারকদেরও বিপাকে পড়ার আশঙ্কা
ভারতীয় আমদানিকারকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, বিদেশি সরবরাহকারীরা নাইজারকে পণ্যের উৎস হিসেবে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় নথি দিয়েছিলেন। তাই নিজেরা আফ্রিকায় গিয়ে প্রতিটি চালানের উৎস যাচাই করা তাদের পক্ষে বাস্তবসম্মত ছিল না।
এক আমদানিকারকের ভাষ্য, সরবরাহকারীরা পণ্য নাইজার থেকে এসেছে বলে জানিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দিয়েছিলেন। ফলে আমদানিকারকদের পক্ষে সরাসরি আফ্রিকায় গিয়ে পণ্যের উৎস যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গত মাসের শেষ দিক থেকে আমদানিকারকদের কাছে শুল্ক বিভাগের নোটিশ পৌঁছাতে শুরু করে। এরপর নাইজার থেকে এসেছে বলে ঘোষণা করা সয়াবিন কেনা অনেক আমদানিকারক বন্ধ করে দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট এক দুবাইভিত্তিক রপ্তানিকারক জানিয়েছেন।

ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছানো বা পথে থাকা কিছু চালানও অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। কারণ এসব পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হলে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক—দুই পক্ষই এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে অনাগ্রহী।
ভারতের সয়াবিন বাজারে নতুন সমীকরণ
এই ঘটনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ভারতের সয়াবিন আমদানি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত বছরের বন্যার পর শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাবেও ভারতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে দেশের চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
নাইজার থেকে ঘোষিত আমদানির ওপর তদন্ত কঠোর হলে আফ্রিকার অন্য উৎপাদক দেশগুলোর জন্য ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে টোগো ও বেনিনের মতো দেশগুলো আনুষ্ঠানিক ও যাচাইযোগ্য চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতে সয়াবিন রপ্তানি বাড়াতে পারে।
তবে নাইজার থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ সয়াবিনের প্রকৃত উৎস নিয়ে ভারতের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক ফাঁকির অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখন মূল প্রশ্ন—নাইজারের নামে ভারতে আসা লাখ লাখ টন সয়াবিন সত্যিই নাইজার থেকে এসেছিল, নাকি বড় একটি অংশ অন্য দেশ থেকে এসে কাগজে-কলমে নাইজারের পণ্য হিসেবে দেখানো হয়েছিল।












