পাকিস্তানে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। দেশটির চারটি প্রদেশ ভেঙে ছোট ছোট প্রশাসনিক অঞ্চল বা নতুন প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর পেছনে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর যুক্তি তুলে ধরা হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রাদেশিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে রাখা শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতা কমাতে চাইছে সেনাবাহিনী। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে দলটির সম্ভাব্য পদযাত্রা। ইমরান খানের সমর্থকেরা তাঁকে মুক্ত করার দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। অন্যদিকে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দুই হাজারের বেশি পণ্যবাহী কনটেইনার বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। কিছু কনটেইনারে পেরেক লাগানো রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শহরে প্রবেশের বিভিন্ন স্থানে লাঠিসজ্জিত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ৪ অক্টোবর পদযাত্রা শুরু হয়। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের লক্ষ্কি মারওয়াত এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ইমরান-সমর্থক যাত্রা শুরু করেন। ইসলামাবাদ থেকে এলাকাটির দূরত্ব প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার। পথে আরও সমর্থক যোগ দেবেন—এমন আশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজধানীতে প্রবেশের বিষয়ে আন্দোলনকারীরা তখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। ফলে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
তবে ইমরান খানকে ঘিরে চলমান আন্দোলনের আড়ালে ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চলছে। পাকিস্তানের কার্যত ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত আসিম মুনির দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চাইছেন। তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোর বর্তমান সীমানা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কাঠামো বদলে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রদেশকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতার ভিত্তিও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সেনাবাহিনীর প্রভাব
গত দুই বছরে পাকিস্তানের সংবিধানে দুবার সংশোধন আনা হয়েছে। একই সময়ে গঠন করা হয়েছে নতুন ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত বা এফসিসি। সমালোচকদের অভিযোগ, আদালতটিতে ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের প্রাধান্য রয়েছে। এর ফলে আগে সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃত্বের অধিকারী সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কার্যত সীমিত হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
গত সেপ্টেম্বরে ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের পক্ষে দেওয়া একটি রায় কার্যকর হওয়ার পথও নতুন আদালতের হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেনাপ্রধান বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ ও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব বেড়েছে।
বেসামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও সেনাপ্রধানের প্রভাব রয়েছে বলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে অনেকেই সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নেতা হিসেবে দেখেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। তাঁকে সেনাপ্রধানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এত ক্ষমতা অর্জনের পরও আসিম মুনির দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট বলে তাঁর ঘনিষ্ঠদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনো নানা সংকটে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ এবং সামরিক বাহিনীর ব্যয় মেটানোর পর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে উন্নয়ন ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করার মতো অর্থ সীমিত থাকে।
গত জুলাইয়ে পেট্রলের ওপর কর বাড়ানো হয়। সেপ্টেম্বরে নতুন করের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা পিছিয়ে যায়। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অসন্তোষও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক সাফল্য বনাম দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট
আসিম মুনির মনে করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার প্রতিফলন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে না। সাবেক ইমরান-ঘনিষ্ঠ এবং বর্তমানে সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিনেটর ফয়সাল ভাওদার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মুনির গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু দেশের বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব একই ধরনের সাফল্য দেখাতে পারেনি বলে সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ মহলে হতাশা রয়েছে।
ভাওদা বর্তমান রাজনৈতিক শ্রেণির সমালোচনা করে দাবি করেছেন, তারা দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন; পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক পক্ষের অভিন্ন অবস্থান নয়। তবে সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ মহলে বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ যে বাড়ছে, নতুন প্রাদেশিক কাঠামো নিয়ে বিতর্কে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
কেন চার প্রদেশ ভেঙে নতুন প্রদেশ গঠনের আলোচনা
নতুন প্রদেশ গঠনের বিতর্ক সামনে আসে গত জুলাইয়ে, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থাকে কার্যত অকার্যকর বলে মন্তব্য করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ সামাল দিতে বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো যথেষ্ট নয়। তরুণদের হতাশা আরও বাড়লে তারা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে উল্টে দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, চারটি বড় প্রদেশকে ছোট ছোট প্রশাসনিক এককে ভাগ করাই সমস্যার সমাধানের একটি পথ।
তবে প্রস্তাবটি সামনে আসার পরই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। কারণ পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধুর মতো প্রদেশ শুধু প্রশাসনিক অঞ্চল নয়; এগুলো দেশটির রাজনীতিতে শক্তিশালী পরিবার ও দলগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভিত্তি।
পাঞ্জাব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। ঐতিহাসিক বাণিজ্যকেন্দ্র লাহোর এবং বিস্তীর্ণ উর্বর কৃষিজমি এই প্রদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গত প্রায় চার দশকে এখানে শরিফ পরিবার ও তাদের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) প্রভাব রয়েছে।
নওয়াজ শরিফ দীর্ঘদিন দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। তাঁর ভাই শেহবাজ শরিফ বর্তমানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী। নওয়াজের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকেও ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাব্য ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। ফলে পাঞ্জাবকে কয়েকটি ছোট প্রদেশে ভাগ করা হলে শরিফ পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবের কাঠামো বদলে যেতে পারে।
অন্যদিকে দক্ষিণের সিন্ধু প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে ভুট্টো পরিবার। পাকিস্তানের প্রধান বন্দরনগরী করাচি এই প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। ষাটের দশকে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) গড়ে তুলে সিন্ধুতে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেন। পরে তিনি দেশের শাসনক্ষমতায় আসেন।
তাঁর মেয়ে বেনজির ভুট্টোও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি নিহত হন। এরপর তাঁর স্বামী আসিফ আলী জারদারি দলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখেন। বর্তমানে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। তাঁর পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধানের হলেও সরকার গঠনে সমর্থন দেওয়া এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। ভুট্টো পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকেও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সংস্কারের যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য
নতুন প্রদেশ গঠনের পক্ষে একটি যুক্তি হলো, বর্তমান প্রদেশগুলো অতিরিক্ত বড় হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পাঞ্জাবে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। গ্রামীণ এলাকার অনেক বাসিন্দাকে জমিসংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রশাসনিক দপ্তরে যেতে হয়। ছোট প্রশাসনিক একক তৈরি হলে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হতে পারে—এমন যুক্তি সমর্থকেরা তুলে ধরছেন।
একই সঙ্গে পাঞ্জাবে শরিফ পরিবারের বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। নওয়াজের প্রাসাদ এবং মরিয়মের উড়োজাহাজ—এ ধরনের উল্লেখকে রাজনৈতিক বিরোধীরা শাসকগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
সিন্ধুতেও দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। প্রদেশটির সাবেক গভর্নর মুহাম্মদ জুবায়েরের অভিযোগ, পিপিপি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। দলটি অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে। আসিফ আলী জারদারিকে পাকিস্তানের অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে প্রশাসনিক দুর্বলতা দূর করার যুক্তির বাইরে নতুন প্রদেশ গঠনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য হতে পারে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল করা। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সেনাবাহিনীর প্রভাব দীর্ঘদিনের। ক্ষমতা ও সম্পদ আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতাও রয়েছে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন।
গত জুনে আসিম মুনির প্রদেশগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অনুদান ছাড়তে বাধ্য করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনুদানের পরিমাণ ছিল মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ৩ শতাংশ। সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন প্রদেশ গঠন করা হলে বেসামরিক সরকারের ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে। পাশাপাশি প্রশাসনিক পদ ও সুযোগ-সুবিধার সংখ্যা বাড়লেও সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
প্রদেশ ভাগ করতে সংবিধানের বাধা
পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রদেশকে ভাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করতে হলে যেসব রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হতে পারে, তাদেরই সম্মতি আদায় করতে হবে।
পিএমএল-এন এ বিষয়ে সমর্থন দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলটি বর্তমানে জনপ্রিয়তার চাপে রয়েছে এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলে সমালোচনা রয়েছে। পাঞ্জাব ভাগ হলে শরিফ পরিবারের প্রভাব কমতে পারে, তবে দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্ব পুরোপুরি হুমকির মুখে পড়বে না—এমন ধারণাও রয়েছে।
পিপিপির জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। করাচি দলটির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাব বিস্তারের ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সিন্ধু প্রদেশের শাসনক্ষমতায় থাকার কারণে দলটি করাচির প্রশাসন ও স্থানীয় সম্পদের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে পারে। অথচ শহরটিতে দলটির জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদ গত সেপ্টেম্বরে নতুন প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। ফলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বড় রাজনৈতিক বাধা তৈরি হয়েছে।
গণভোটের সম্ভাবনা ও শক্তিশালী প্রেসিডেন্টের ধারণা
আসিম মুনির ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের বিষয়ে অনড় বলে দাবি করা হচ্ছে। ফয়সাল ভাওদার ধারণা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে জাতীয় গণভোট আয়োজন করা হতে পারে। এমনটি হলে প্রাদেশিক পরিষদের অনুমোদনের সাংবিধানিক শর্ত কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
কিছু পর্যবেক্ষকের আশঙ্কা, জাতীয় গণভোটের উদ্যোগ ভবিষ্যতে সেনাপ্রধানের জন্য আরও শক্তিশালী নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ২০০০-এর দশকে বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখলের পর রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগকে তখন সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের কিছু মিল দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
তবে আসিম মুনিরের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর প্রতি ব্যাপক জনসমর্থনের প্রমাণ নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মিত্রদের সবাইকে অসন্তুষ্ট করে নতুন কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ইমরান খান কারাবন্দি থাকলেও তাঁর প্রতি জনসমর্থন ও রাজনৈতিক আকর্ষণ পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পিটিআইয়ের কিছু নেতাও সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে মতপার্থক্যের সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন। দলটির সাবেক এক মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার অপেক্ষায় রয়েছেন, যা বিদ্যমান ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখন দুটি সমান্তরাল লড়াই চলছে। একদিকে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন ও সরকারের সঙ্গে পিটিআইয়ের সংঘাত; অন্যদিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। নতুন প্রদেশ গঠন সত্যিই প্রশাসনিক সেবা উন্নত করার পদক্ষেপ হবে, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার হাতিয়ার হয়ে উঠবে—তা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া, সাংবিধানিক বৈধতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।












