ভারতের শিল্পায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি চালু করে উৎপাদনশিল্পকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় আয়ের এক-চতুর্থাংশ উৎপাদনশিল্প থেকে অর্জন করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ২০২৫ সালেও ভারতের মোট জাতীয় আয়ে উৎপাদনশিল্পের অবদান ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। এক দশক ধরে এই হার খুব একটা বাড়েনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের শিল্প খাতে নতুন গতি দেখা যাচ্ছে। গাড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ছে। বিশেষ করে দেশটির পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের চারটি রাজ্যে শিল্পকারখানা, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠছে। এসব অঞ্চলের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারতের শিল্পায়ন থেমে নেই; বরং দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে না ছড়িয়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
উৎপাদন বাড়ছে, রপ্তানিতেও নতুন সম্ভাবনা
ভারতের উৎপাদনশিল্পের সাম্প্রতিক অগ্রগতির একটি উদাহরণ গুজরাটের আহমেদাবাদের উপকণ্ঠে তৈরি রঘুবীর এক্সিমের নতুন কারখানা। বিছানার চাদর, বালিশের কভার ও অন্যান্য শয্যাসামগ্রী তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ২০০ একর বা ৮০ হেক্টর জমির ওপর গড়ে ওঠা কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর কাজ করার কথা।
কারখানাটিতে উন্নতমানের ইউরোপীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। তুলনামূলক সস্তা চীনা যন্ত্রপাতির পরিবর্তে উন্নত প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ওপরও নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভারতের শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এই উদ্যোগের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
তবে শুরুটা খুব একটা ভালো হয়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে কারখানাটি তার মোট উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পেরেছিল বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তা হার্দিক আগরওয়াল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় রপ্তানি ব্যবসায় বড় ধাক্কা লাগে।
ভারতের উৎপাদনশিল্পে এ ধরনের হতাশার ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৬ সালের আগস্টে ভারতের উৎপাদনশিল্পের উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এই অগ্রগতির বড় ভূমিকা রয়েছে।
এর পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব আছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। দেশটি সাধারণত ডলারে তেল আমদানি করে। তেলের দাম বাড়ায় ডলারের চাহিদা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেড়েছে, অন্যদিকে ভারতীয় রুপির মূল্য কমেছে। রুপির দরপতনে বিদেশ থেকে পণ্য কেনা ব্যয়বহুল হলেও ভারতীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সস্তা হতে পারে।
৭ অক্টোবর ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। তবে তাতেও রুপির দরপতন পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি।
অন্যদিকে ভারতের রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ডলারের হিসাবে ২০২৬ সালের আগস্টে দেশটির ইলেকট্রনিক পণ্যের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য তৈরি আইফোন।
চার রাজ্যে গড়ে উঠছে ভারতের শিল্পায়নের প্রধান বলয়
ভারতের শিল্পায়নের অগ্রগতি সবচেয়ে স্পষ্ট গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে। এই চার রাজ্যকে একত্রে ভারতের শিল্পায়নের একটি শক্তিশালী বলয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
গুজরাটে পেট্রোরসায়ন ও ওষুধশিল্পের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম তৈরির শিল্পও বিকশিত হয়েছে। সেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মহারাষ্ট্রে বিস্তৃত হয়েছে উৎপাদনশিল্পের আরেকটি বড় কেন্দ্র। রাজ্যটির পুনে শহর গাড়ি তৈরির শিল্পের জন্য পরিচিত। অন্যদিকে মুম্বাই ভারতের প্রধান আর্থিক কেন্দ্র হওয়ায় শিল্প ও ব্যবসায় অর্থায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এরপর এই শিল্পবলয় বিস্তৃত হয়েছে কর্ণাটকে। বেঙ্গালুরুকে কেন্দ্র করে সেখানে প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি উড়োজাহাজ নির্মাণ ও প্রতিরক্ষাশিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আরও দক্ষিণে তামিলনাড়ুতে গাড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং অন্যান্য শিল্পের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
এই চার রাজ্যে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের বসবাস, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অথচ দেশটির উৎপাদনশিল্পে মোট যে মূল্য সংযোজন হয়, তার প্রায় অর্ধেক আসে এই অঞ্চল থেকে। বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলার বা ২৪০ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদনমূল্য সংযোজন করে অঞ্চলটি।
ভারতের শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ বুঝতে এই বৈপরীত্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল জনসংখ্যা ও সম্ভাবনাময় বাজার থাকা সত্ত্বেও দেশের সব অঞ্চলে শিল্পের সমান বিকাশ ঘটেনি। বরং যেখানে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, দক্ষতা ও সরবরাহব্যবস্থা একসঙ্গে গড়ে উঠেছে, সেখানেই উৎপাদনশিল্প দ্রুত এগিয়েছে।
বিনিয়োগ আনতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা
এই চার রাজ্যের অভিজ্ঞতা থেকে প্রথম যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো শিল্পায়নের জন্য শুধু বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করলেই হয় না; বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়।
গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০০৩ সালে ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাট’ নামে দুই বছর অন্তর বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন শুরু করেন। এর মাধ্যমে রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী মহল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পায়। দীর্ঘ সময় ধরে এই উদ্যোগ গুজরাটকে শিল্প বিনিয়োগের একটি পরিচিত গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে।
মহারাষ্ট্রেও বিনিয়োগ আকর্ষণে পরিকল্পিত উদ্যোগ রয়েছে। রাজ্যটির শিল্প উন্নয়ন সংস্থা জমি অধিগ্রহণ, শিল্পাঞ্চল তৈরি এবং কারখানায় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ নিশ্চিত করার কাজ করে। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য কারখানা স্থাপন তুলনামূলক সহজ হয়।
তামিলনাড়ুতে ‘গাইডেন্স তামিলনাড়ু’ নামের একটি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্ভাব্য উৎপাদনকেন্দ্র চিহ্নিত করা, জমি ও অবকাঠামোর বিষয়ে সহায়তা দেওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করে।
তবে ভারতের সব রাজ্যে একই ধরনের পরিবেশ নেই। একজন উৎপাদনশিল্পের নির্বাহীর বক্তব্য অনুযায়ী, তামিলনাড়ুতে কোনো অনুমোদন পেতে অর্থ ব্যয় করতে হলেও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া যায়। দেশের অন্য কিছু অঞ্চলে ঘুষ দেওয়ার পরও নতুন করে অর্থ দাবি করা হয়, অথচ প্রয়োজনীয় অনুমোদন মেলে না।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শিল্পায়নের ক্ষেত্রে শুধু করছাড় বা ভর্তুকি যথেষ্ট নয়। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, নির্ভরযোগ্য অনুমোদনব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারের কার্যকর যোগাযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বড় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন শিল্পাঞ্চল
চার রাজ্যের শিল্পায়নের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অনেক শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রথমে একটি বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। পরে সেই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে ছোট-বড় সরবরাহকারী ও সহযোগী শিল্পের বিস্তার ঘটেছে।
গুজরাটের সানন্দ শহর এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পশ্চিমবঙ্গে জমি ও শিল্প স্থাপন নিয়ে বিরোধ এবং পুঁজিবিরোধী বিক্ষোভের কারণে টাটা মোটরসের একটি প্রকল্প সেখানে সমস্যায় পড়েছিল। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটি সানন্দে নতুন কারখানা চালু করে। গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিষ্ঠানটিকে রাজ্যে উৎপাদন সরিয়ে নিতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
টাটা মোটরসের কারখানা চালুর পর সানন্দে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। বড় কারখানাটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় সরবরাহব্যবস্থা। এতে যন্ত্রাংশ পরিবহন, উৎপাদন সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ সহজ হয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিসিজির রাহুল জৈনের মতে, ভারতে যেসব শিল্পাঞ্চল সফল হয়েছে, সেগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই একটি বড় বা প্রধান প্রতিষ্ঠান শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই মডেলের সুবিধা হলো, বড় প্রতিষ্ঠান প্রথমে বাজার তৈরি করে এবং ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনের সুযোগ দেয়। সরবরাহকারীরা ধীরে ধীরে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে পারে। ফলে একটি কারখানার বিনিয়োগ থেকে পুরো অঞ্চলে শিল্পের বিস্তার ঘটে।
আইফোন উৎপাদন থেকে স্থানীয় যন্ত্রাংশ শিল্পের বিকাশ
ভারতের শিল্পায়নের এই মডেল এখন ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনেও দেখা যাচ্ছে। দেশটিতে বর্তমানে বিশ্বের মোট আইফোনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংযোজন করা হয়। কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠান ফক্সকন এবং টাটা গোষ্ঠীর টাটা ইলেকট্রনিকস এসব ফোন উৎপাদন করছে।
শুরুর দিকে ভারতে আইফোন তৈরির কারখানাগুলো মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানোর কাজ করত। ফলে সমালোচকেরা বলতেন, উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নরেন্দ্র মোদি সরকারের ২০২০ সালে চালু করা উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা কর্মসূচির অর্থ আসলে চীনে তৈরি যন্ত্রাংশ আমদানিতেই ব্যয় হচ্ছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। স্মার্টফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির প্রতিষ্ঠানও এখন ভারতে কারখানা স্থাপন করছে। ফলে শুধু বিদেশি যন্ত্রাংশ এনে ফোন সংযোজন নয়, স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ তৈরি এবং উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে মূল্য সংযোজনের সুযোগও বাড়ছে।
শিল্প খাতের একটি হিসাব অনুযায়ী, ভারতে স্মার্টফোন উৎপাদনের মাধ্যমে সৃষ্ট মূল্য সংযোজন ২০২১ সালের ৪৫০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
এই পরিবর্তন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি পণ্য সংযোজন করা এবং সেই পণ্যের যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নিজ দেশে তৈরি করা এক বিষয় নয়। স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা যত শক্তিশালী হবে, তত বেশি অর্থ দেশের ভেতরে থাকবে। একই সঙ্গে নতুন প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরির সুযোগও বাড়বে।
সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি শিল্পে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
ভারত এখন স্মার্টফোন উৎপাদনের অভিজ্ঞতা সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি শিল্পেও কাজে লাগাতে চায়। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো, শুধু চূড়ান্ত পণ্য তৈরি নয়; উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও মধ্যবর্তী উপকরণও ধীরে ধীরে দেশে তৈরি করা।
গবেষণা সংস্থা এমবারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর চীন থেকে তৈরি সৌর প্যানেল আমদানির পরিমাণ কমেছে। অন্যদিকে সৌর প্যানেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সৌরকোষ এবং সৌরকোষ তৈরির উপকরণ ওয়েফার আমদানি প্রথম দিকে বেড়েছিল। পরে ভারতের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব উপকরণের আমদানিও কমতে শুরু করে।
গুজরাট এখন ভারতের সৌরশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে সৌর প্যানেলের অ্যালুমিনিয়াম কাঠামোসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করছে বিষাখা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা জিগিশ দোশির মতে, গুজরাটে এখন প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং ভালো মান বজায় রেখে সৌরশিল্পের প্রয়োজনীয় সব ধরনের উপকরণ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। প্যানেলের জন্য প্রয়োজনীয় কাচ তৈরির একটি চুল্লি স্থাপনের কাজও চলছে।
একসময় ভারতের সৌর প্যানেল রপ্তানি দ্রুত বাড়ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভারতীয় সৌর পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপ করলে সেই অগ্রযাত্রায় বাধা তৈরি হয়।
এদিকে ব্যাটারি উৎপাদনেও বিনিয়োগ বাড়ছে। ভারতের বড় শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও আদানি গ্রুপ চীনের বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিএটিএলের সঙ্গে ভারতে যৌথভাবে উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।
এই উদ্যোগ সফল হলে বৈদ্যুতিক গাড়ি, জ্বালানি সংরক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারত উপকৃত হতে পারে। তবে এর জন্য উন্নত প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও তৈরি হচ্ছে ভিত্তি
ভারতের শিল্পায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী চিপ। আধুনিক গাড়ি, ফ্রিজ, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার এবং অসংখ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালাতে এসব চিপ প্রয়োজন হয়। ফলে চিপ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করতে পারলে ভারত তার বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায়ও জায়গা করে নিতে পারে।
২০২৬ সালে ভারতে নতুন পাঁচটি চিপ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণকেন্দ্র চালু হয়েছে। এর মধ্যে চারটি গড়ে উঠেছে শিল্পায়নের ওই চার রাজ্যের বলয়ে।
এসব কেন্দ্রের অধিকাংশই গাড়ি, ফ্রিজ ও অন্যান্য সাধারণ ইলেকট্রনিক পণ্যে ব্যবহৃত তুলনামূলক মৌলিক চিপ সংযোজন ও পরীক্ষার কাজ করে। আগামী বছরগুলোতে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ভারত সরকার শুধু সাধারণ চিপের উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। উন্নতমানের চিপ তৈরির সক্ষমতাও গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এ জন্য চিপ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উচ্চ বিশুদ্ধতার গ্যাস এবং অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তৈরি যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের একটি শিল্প সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চিপ উৎপাদনের সরবরাহব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় এসব গ্যাস ও নির্ভুল যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ভারতে স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সহজ নয়। কারণ, এই শিল্পে বিপুল পুঁজি, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তাই নতুন কারখানা চালু হওয়া মানেই ভারত এখনই উন্নত চিপ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে—এমন নয়।
উৎপাদনে এগোলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ভারত
ভারতের শিল্পায়নের অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও দেশটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। চার রাজ্যের এই শিল্পবলয় এখনো বিশ্বের প্রধান উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
উৎপাদনশিল্পে এই অঞ্চল বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলারের মূল্য সংযোজন করলেও তার জনসংখ্যা তুরস্কের তুলনায় অনেক বেশি। মোট উৎপাদনের পরিমাণ তুরস্কের কাছাকাছি হলেও জনসংখ্যার হিসাবে ভারতের এই শিল্পবলয়ে উৎপাদনশীলতা অনেক কম। চার রাজ্যের শিল্পবলয়ে উৎপাদনের পরিমাণ তুরস্কের কাছাকাছি হলেও সেখানে মানুষের সংখ্যা প্রায় চার গুণ।
দ্রুত শিল্পায়নের পথে থাকা আরেক এশীয় দেশ ভিয়েতনামের সঙ্গেও ভারতের তুলনা করা যায়। মাথাপিছু উৎপাদনশিল্পের হিসাবে ভারতের এই চার রাজ্যের উৎপাদন ভিয়েতনামের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম।
এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, ভারতে শিল্পকারখানা ও উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার উন্নতির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। শুধু বড় বাজার বা বিপুল জনসংখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সম্ভব নয়। একই পরিমাণ শ্রম ও সম্পদ ব্যবহার করে বেশি পণ্য তৈরি করতে পারাই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম শর্ত।
কর ও আইনি জটিলতায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
ভারতের শিল্পায়নের পথে আরেকটি বড় বাধা হলো সরকারি প্রশাসন, করব্যবস্থা এবং আইনি অনিশ্চয়তা। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের বিশাল বাজার ও উৎপাদনের সম্ভাবনায় আগ্রহী হলেও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
দেশটির করব্যবস্থা জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতীতের লেনদেন নিয়েও বড় অঙ্কের কর দাবি বা আইনি বিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে।
ফরাসি পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পেরনো রিকার্ডের বিরুদ্ধে অতীত সময়ের কর বাবদ ৩১৪ মিলিয়ন ডলার বা ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলার দাবি করা হচ্ছে। জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফক্সভাগেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমদানি শুল্ক কম দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা ভারতে আনা কিছু যন্ত্রাংশের শ্রেণিবিন্যাস ভুলভাবে করেছিল। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের আইনি মামলা চলছে।
অন্যদিকে অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের কার্যক্রম নিয়ে ভারতের প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই তিন প্রতিষ্ঠানই তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এসব বিরোধের ফল যা-ই হোক, বিনিয়োগকারীদের কাছে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। কোনো দেশে কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু শ্রমিকের মজুরি, জমির দাম বা বাজারের আকার বিবেচনা করা হয় না। ভবিষ্যতে কী ধরনের কর দিতে হবে, আমদানি নীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না, আইনি বিরোধ কতটা দীর্ঘ হবে এবং সরকারি সিদ্ধান্ত কতটা অনুমানযোগ্য—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত যদি আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়, তাহলে করব্যবস্থাকে সহজ করা, নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের চাপেও আশাবাদী ভারতীয় উদ্যোক্তারা
বিভিন্ন বাধা থাকা সত্ত্বেও ভারতের শিল্পোদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। গুজরাটের রঘুবীর এক্সিমের হার্দিক আগরওয়ালও তাঁদের একজন। তাঁর কারখানা এখনো পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে ব্যবসায় যে ধাক্কা লেগেছে, সেটিও পুরোপুরি কাটেনি।
তবে তিনি ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন বাজার খুঁজে পেয়েছেন। এসব বাজারে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কজনিত ক্ষতি কিছুটা সামাল দেওয়ার আশা করছেন তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর সম্ভাবনার দিকেও নজর রাখছেন।
ভারতের বড় সুবিধা হলো, অনেক শিল্পক্ষেত্রে এখনো দেশীয় প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারে জায়গা তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। তবে শিল্পায়ন দ্রুত এগিয়ে গেলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তখন শুধু উৎপাদনক্ষমতা থাকলেই হবে না; পণ্যের মান, উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
ভারতের শিল্পায়নের বর্তমান চিত্র তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার গল্প। একদিকে উৎপাদনশিল্পে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশটির সব অঞ্চলে এই অগ্রগতি সমান নয়। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে যে শিল্পভিত্তি গড়ে উঠেছে, তা অন্য রাজ্যগুলোর জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে।
তবে এই অগ্রগতি পুরো ভারতের শিল্পায়নে রূপ দিতে হলে আরও বেশি কর্মসংস্থান, উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি, স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও উন্নত করতে হবে।
ভারতের শিল্পায়ন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতি কত দ্রুত দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারত কতটা দক্ষতার সঙ্গে বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থায় নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারে।












