ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজারে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে এশিয়ার বাজারে এলএনজির দাম যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে। সামনে ইউরোপের শীতকাল, গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তবে সংকটের আরেকটি দিকও রয়েছে। বর্তমান ঘাটতি মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন এলএনজি প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। এসব প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী চালু হলে দশকের শেষ দিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে। ফলে এখনকার উচ্চমূল্যের বাজার ভবিষ্যতে অতিরিক্ত সরবরাহ, মূল্যপতন এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কাতারের সরবরাহ বন্ধ, বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা
চার বছর আগে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইউরোপকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়েছিল। সে সময় ইউরোপের গ্যাস আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশের ঘাটতি পূরণে কাতারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তখন বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক ছিল কাতার। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি সে সময় গর্ব করে বলেছিলেন, ২৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা নির্ভরযোগ্যভাবে গ্যাস সরবরাহ করে আসছেন এবং কখনো কোনো চালান দিতে ব্যর্থ হননি।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থাই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মার্চে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে কাতার চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে না বলে ঘোষণা দেয়। দেশটি চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পূরণে অপারগতার কথা জানিয়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়মুক্তির বিধান কার্যকর করে।
এরপর থেকে কাতার মাত্র ৯৮টি এলএনজি চালান পাঠাতে পেরেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫৩৬টি কম। সরবরাহের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ টনে। গত বছর বিশ্বজুড়ে মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৯ শতাংশের সমান এই পরিমাণ। সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় ঘাটতি আরও বাড়ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামে। এশিয়ায় প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম প্রায় ২৫ ডলারে উঠেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি।

তবে বর্তমান দাম ২০২২ সালের সর্বোচ্চ ৭০ ডলারের তুলনায় এখনও অনেক কম। সে সময় ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এবার বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ কার্যত বাজারের বাইরে চলে গেলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এশিয়া আপাতত বিকল্প উৎসে চাহিদা মেটাচ্ছে
কাতারের এলএনজি রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আগে এশিয়ায় যেত। সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পরও এশিয়ার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন উৎপাদক দেশের কাছ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করছে।
২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত এশিয়ার এলএনজি আমদানি হয়েছে ১৯ কোটি ৩০ লাখ টন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি মাত্র ৭০ লাখ টন কম। ফলে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে অঞ্চলটি আপাতত বড় ধরনের ঘাটতি এড়াতে পেরেছে।
এ কারণে অনেকের ধারণা, বিশ্ববাজার পরিস্থিতি যতটা উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে, বাস্তবে সংকট হয়তো ততটা গভীর হবে না। বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের আলোচনায় ডিজেলের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও গ্যাসের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
কিন্তু এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। কারণ, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর আগামী কয়েক মাসে একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপের শীতকালীন চাহিদা, কাতারের উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং নতুন সরবরাহের উৎস নিশ্চিত করা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের শীতকাল নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইউরোপের গ্যাস কোম্পানিগুলো সাধারণত গ্রীষ্মকালে শীতের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত করে। ২০২২ সালে গ্যাসের দাম আগস্টে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর অন্যতম কারণ ছিল শীতের আগে সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপের ক্রেতারা আটলান্টিক অঞ্চল থেকে আসা অনেক এলএনজি চালান এশিয়ার ক্রেতাদের কিনে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এর ফলে ইউরোপের গ্যাসের মজুত প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
কিছু ক্রেতা এখনও আশা করছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে এবং কাতারের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে। অন্যরা আবার ধারণা করছেন, এল নিনোর প্রভাবে ইউরোপে শীত তুলনামূলক উষ্ণ থাকবে। এল নিনো এমন একটি আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার ইউরোপের মানুষ দেরিতে ঘর গরম করার যন্ত্র চালু করতে পারেন। সেই হিসাব ধরে গ্যাসের চাহিদাও তুলনামূলক কম থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস ভুল হলে তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। ইউরোপের গ্যাসের মজুত বর্তমানে মোট ধারণক্ষমতার মাত্র ৭৩ শতাংশ। বছরের এই সময়ে এত কম মজুত আগে দেখা যায়নি। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে গড় মজুত ছিল ৯০ শতাংশ। জার্মানিতে মজুতের পরিমাণ আরও কম, মাত্র ৫৯ শতাংশ।
জ্বালানি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সিক্স ওয়ান কমোডিটিজ গত দশ বছরের শীতকালীন আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে একটি কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দেখতে চেয়েছে, বর্তমান মজুত নিয়ে ইউরোপ শীত পার করলে বসন্তে কতটা গ্যাস অবশিষ্ট থাকবে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দশ শীতের মধ্যে তিনটির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে গ্যাসের মজুত এতটাই কমে যেতে পারে যে সরবরাহ থেকে গ্যাস উত্তোলনের গতি কমাতে হবে এবং জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।

জার্মানির উদ্যোগ, কিন্তু ইউরোপের প্রস্তুতি যথেষ্ট কি না
গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর জার্মান সরকার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত আট টেরাওয়াট-ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। এই পরিমাণ প্রায় আটটি এলএনজি চালানের সমান। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে ইউরোপীয় কমিশন শীতের আগে গ্যাসের মজুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার আগের বাধ্যবাধকতা আবার চালু করতে তাড়াহুড়ো করছে না। যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে এই শর্ত শিথিল করা হয়েছিল।
এখনই বাধ্যতামূলকভাবে মজুত বাড়াতে বললে ইউরোপের দেশগুলোকে একসঙ্গে বাজারে নেমে গ্যাস কিনতে হতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং উচ্চমূল্যে গ্যাস সংগ্রহ করতে হবে।
বাজারের আরেকটি সমস্যা হলো, তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য গ্যাসের দাম ভবিষ্যতের নির্ধারিত সরবরাহের দামের চেয়ে বেশি। ফলে আমদানিকারকদের কাছে এখনই বিপুল পরিমাণ গ্যাস কিনে মজুত করার আর্থিক প্রণোদনা কম।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষক ঝি শিন চং মনে করেন, আবহাওয়া উষ্ণ থাকলে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে কাতারের সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ইউরোপ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। তখন গ্যাসের দামও কমতে পারে।
কিন্তু এই সম্ভাবনার সঙ্গে দুটি বড় অনিশ্চয়তা জড়িত—আবহাওয়া কেমন থাকবে এবং কাতার কখন উৎপাদন ও রপ্তানি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারবে।
নভেম্বরের ঠান্ডায় গ্যাসের দাম ৪০ ডলারে উঠতে পারে
নভেম্বরে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়লে ইউরোপের দেশগুলো দ্রুত গ্যাস সংগ্রহে নামবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সে ক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠতে পারে।
ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের মধ্যে একই চালান কেনার প্রতিযোগিতা তীব্র হবে। তখন গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একজন সাবেক সিঙ্গাপুরভিত্তিক জ্বালানি কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, শীত অত্যন্ত তীব্র হলে গ্যাসের দামের কোনো নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা নাও থাকতে পারে।

এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় অন্য কোনো সমস্যা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জলাধারে পানির ঘাটতি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা ইউরোপের জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলার মতো ঘটনা গ্যাসের দামকে আরও উঁচুতে ঠেলে দিতে পারে।
কাতারের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। দেশটি এখনও তাদের এলএনজি উৎপাদন ও তরলীকরণকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করেনি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে শান্তি ফিরে আসবে—এমন নিশ্চয়তা দেশটির কর্তৃপক্ষও দেখছে না।
কাতারের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী বছরের শীতের আগে ইউরোপের গ্যাসের মজুত পুনরায় পূরণ করতে অতিরিক্ত দুই কোটি টন এলএনজি প্রয়োজন হতে পারে। সেই ঘাটতি পূরণের জন্য ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় ২০২৭ সালজুড়েও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে রাখতে পারে।
সংকট থেকেই নতুন এলএনজি প্রকল্পের বিস্তার
ইরান যুদ্ধের আগে অনেক বিশ্লেষক মনে করছিলেন, ২০২৬ সালেই বিশ্ববাজারে এলএনজির অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হবে। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের সংকট সেই ধারণাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
তারপরও যেসব নতুন এলএনজি প্রকল্পের ওপর ভবিষ্যতের অতিরিক্ত সরবরাহের আশা নির্ভর করছিল, সেগুলোর বেশির ভাগের কাজ এগিয়ে চলছে। বরং বর্তমান সংকট যত গভীর হচ্ছে, নতুন প্রকল্পের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তত বাড়ছে।
সিক্স ওয়ান কমোডিটিজের বিশ্লেষক অ্যামি পারপিয়ার মতে, বর্তমান সংকট যত তীব্র হবে, ভবিষ্যতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে।
গত মাসে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত গ্যাসটেক সম্মেলনে এই প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চার দিনব্যাপী ওই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের গ্যাস রপ্তানিকারক, প্রকল্প উন্নয়নকারী, বড় জ্বালানি কোম্পানি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্প তুলে ধরে। প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনী, গ্যাসবাহী জাহাজের নমুনা এবং নতুন অবকাঠামোর পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতের সরবরাহ সক্ষমতা তুলে ধরে।
একদিকে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতের গ্যাস সরবরাহের চুক্তি করছেন, অন্যদিকে যন্ত্রপাতি নির্মাতারা নতুন প্রকল্পের জন্য অর্ডার পাচ্ছেন। আমদানিকারকেরাও এখন নতুন চুক্তি করতে ব্যস্ত। তবে একই সঙ্গে তাদের উদ্বেগ, ভবিষ্যতে চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস কিনে ফেলতে হয় কি না।
এই পরিস্থিতিতে বাজারের প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা। কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে আমদানিকারকেরা।
২০৩০ সালের মধ্যে সরবরাহ বাড়বে প্রায় ৬০ শতাংশ
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক মাসিমো দি ওয়ার্দোর মতে, ভবিষ্যতে দামের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—এমন ধারণা নতুন এলএনজি প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে। বছরের শুরুতে যেসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই এখন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি উৎপাদন ও তরলীকরণ সক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। কানাডার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এ ছাড়া ছোট আকারের ও পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণযোগ্য তরলীকরণ প্রযুক্তির প্রসার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। আর্জেন্টিনা থেকে সেনেগাল পর্যন্ত যেসব দেশে আগে বড় এলএনজি প্রকল্প গড়ে তোলার মতো অবকাঠামো ছিল না, সেখানেও গ্যাস রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নতুন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালে বিশ্বের এলএনজি সরবরাহ ৬৩ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। গত বছরের তুলনায় যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
কিন্তু সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা একই হারে বাড়বে না। যুদ্ধের আগে যেসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক দেশ তার চেয়ে কম গ্যাস আমদানি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে চীনসহ কয়েকটি দেশ নতুন এলএনজি আমদানি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করেছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আরেকটি ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে নতুন অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া নাও যেতে পারে।
এর পরিবর্তে অনেক দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আবার চালু করছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন প্রকল্পের জন্য বড় দরপত্র আহ্বান করছে এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্ট্যাড এনার্জির পূর্বাভাস অনুযায়ী, দশকের শেষ দিকে বিশ্বে বছরে এলএনজির চাহিদা দাঁড়াতে পারে ৫৭ কোটি ৪০ লাখ টনে। যুদ্ধের আগে এই পূর্বাভাস ছিল ৫৮ কোটি ৩০ লাখ টন।

সংকটের পরেই আসতে পারে অতিরিক্ত সরবরাহ
কাতার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করলে এবং পরিকল্পিত সব নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালে বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ চাহিদার চেয়ে পাঁচ কোটি ৫০ লাখ থেকে সাত কোটি ৫০ লাখ টন বেশি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বাজারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কোনো কোনো উৎপাদককে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার না করে কম গ্যাস উৎপাদন করতে হবে। আবার কোনো কোনো ক্রেতাকে নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্যাস কিনতে হতে পারে। এমনকি দুই ধরনের পরিস্থিতি একসঙ্গেও তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সরবরাহের এই উদ্বৃত্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ছয় ডলারের নিচে নেমে যেতে পারে। অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গ্যাস উৎপাদন করে বাজারে পাঠানোর খরচের তুলনায় এই দাম কম।
অর্থাৎ, বর্তমানে যে উচ্চমূল্য নতুন প্রকল্প নির্মাণকে লাভজনক বলে মনে করাচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোই লোকসানের মুখে পড়তে পারে।
জ্বালানি কোম্পানিগুলোর নতুন কৌশল: বেশি বিকল্প, বেশি ঝুঁকি
সামনের কয়েক বছর বাজারে অনিশ্চয়তা থাকবে—এমন আশঙ্কায় গ্যাসের ক্রেতা ও বিক্রেতারা এখন নিজেদের হাতে বিকল্প বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্যবসায়িক পরিভাষায় এই কৌশলকে বলা হয় ‘অপশনালিটি’। অর্থাৎ, বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী গ্যাস কেনা, মজুত করা কিংবা বিক্রি করার স্বাধীনতা ধরে রাখা।
জাপানের জেরা এবং জার্মানির ইউনিপারের মতো বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তারা গ্যাস কেনাবেচার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ করছে, মজুতের সুবিধা বাড়াচ্ছে এবং গ্যাসকে পুনরায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সাধারণ গ্যাসে রূপান্তর করার অবকাঠামো সংগ্রহ করছে।
এর উদ্দেশ্য হলো, বাজারে দাম কম থাকলে গ্যাস কিনে রাখা এবং পরে দাম বাড়লে তা বিক্রি করা। অন্যদিকে প্রকল্প উন্নয়নকারীরা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে নিজেরাই গ্যাস কেনাবেচার ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যাতে লাভের বেশি অংশ নিজেদের কাছে রাখা যায়।
বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোও ছোট ক্রেতাদের জন্য একই সঙ্গে সরবরাহ, বাণিজ্য ও অন্যান্য সেবা দেওয়ার চুক্তি করছে।
কিন্তু এই কৌশলের মধ্যেও ঝুঁকি রয়েছে। বাজারে ব্যবসায়ীর সংখ্যা ও লেনদেন বাড়লেও শেষ পর্যন্ত গ্যাস ব্যবহারকারীদের প্রকৃত চাহিদা না বাড়লে অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রি করা কঠিন হবে।
অনেক প্রতিষ্ঠান এমন চালানের মালিক হয়ে যেতে পারে, যা বিক্রি করার মতো ক্রেতা তারা খুঁজে পাবে না। এতে গ্যাস মজুতের খরচ বাড়বে এবং বড় আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিলে ব্যাংক ও অন্যান্য বিনিয়োগকারীও নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধের কারণে এলএনজি বাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার তাৎক্ষণিক প্রভাব ইতিমধ্যে স্পষ্ট। কাতারের সরবরাহ বন্ধ, ইউরোপের কম মজুত এবং এশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে শীতের আগে গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি আরও জটিল। বর্তমান সংকটের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন এলএনজি প্রকল্পের বিস্তার ঘটছে। কিন্তু যুদ্ধের পর ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে অনেক দেশ গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কয়লা কিংবা পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে।
ফলে একদিকে নতুন সরবরাহ বাড়বে, অন্যদিকে চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কমে যেতে পারে। এতে বাজারে অতিরিক্ত গ্যাস জমে যাওয়া এবং দাম উৎপাদন ব্যয়ের নিচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বর্তমান সংকট তাই শুধু গ্যাসের ঘাটতি কিংবা উচ্চমূল্যের সমস্যা নয়। এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো বদলে দিতে পারে। এখন যে দেশ ও কোম্পানিগুলো সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপুল বিনিয়োগ করছে, ভবিষ্যতে তাদেরই অতিরিক্ত উৎপাদন, কম দাম এবং লোকসানের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হতে পারে।












