সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আবারও শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির জ্বালানি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান আরামকোর কার্যক্রম পরিচালিত হয়—এমন এলাকার একটি ভবনে হুতিদের হামলার কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার (১৪ অক্টোবর) নতুন করে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে চলমান সংঘাতের আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুতিদের শক্ত ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো রাজধানী রিয়াদের কেন্দ্রের আরও কাছাকাছি চলে আসায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বুধবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, রিয়াদের দিকে ছোড়া হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। একই দিন শহরে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ সময় মুঠোফোনে আকাশপথে হামলার সতর্কবার্তা পাঠিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়। কয়েক মিনিট পর সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
আরামকোর স্থাপনায় হামলা, হতাহতের খবর নেই
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার ধাহরানে আরামকোর একটি ভবনে হামলা হয়। এতে সীমিত পরিসরে আগুন লাগলেও কেউ হতাহত হননি।
ধাহরানে আরামকোর প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। সেখানে একাধিক ভবন ও আবাসিক স্থাপনা নিয়ে বিস্তৃত একটি কমপ্লেক্স রয়েছে।
এদিকে রিয়াদের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুতিদের দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজন নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে রিয়াদের আকাশে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যেতে দেখা যায়। এরপর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি বিপণিবিতানের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বস্তু থেকে হলুদাভ আলোর রেখা ও ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। পরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ইয়েমেনে তেল স্থাপনায় সৌদি জোটের হামলা
হুতিদের হামলার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন তেল স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, সৌদি আরব, ইয়েমেন, লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলতে হুতিদের ব্যবহৃত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল-মাসিরা টেলিভিশন একটি তেল কোম্পানিতে সৌদি হামলার খবর প্রচার করেছে।
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। দীর্ঘদিনের এই সংঘাতে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন করে হামলা বাড়ায় হুতিদের নিয়ন্ত্রিত সানায় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় মানুষ পেট্রলপাম্পগুলোতে ভিড় করছেন।
বিমানবন্দরে হামলার পর বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
গত শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হন। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৫ সালের পর সৌদি আরবে এটিকে অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতির অবনতিতে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে একাধিক দেশ। মঙ্গলবার ফ্রান্স তার নাগরিকদের রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে রিয়াদে যানবাহন চলাচলও কমেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দূরশিক্ষণ চালু করা হয়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সৌদি মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে দেওয়া হবে না।
অর্থনীতিতেও বাড়ছে যুদ্ধের চাপ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর সৌদি আরবের মোট দেশজ উৎপাদন ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। এরপর থেকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও অবরোধের কারণে সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ইয়েমেনের স্থগিত সংঘাত আবার শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালিয়েছে হুতিরা। সৌদি আরবের জন্য এই নৌপথ হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হুতিরা অত্যন্ত খারাপ আচরণ করছে এবং সম্ভবত ইরানের নির্দেশে কাজ করছে। আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
তবে হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে জড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও স্থাপনাগুলোও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বুখাইতির ভাষ্য, সৌদি আরবকে এই বার্তা দেওয়াই তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য—ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে সৌদি নেতৃত্ব আর নিরাপদ অবস্থানে থাকতে পারবে না।
সৌদি আরবের রাজধানীর কাছাকাছি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।












