পোপ লিওর ফুসফুসে অ্যাডেনোকার্সিনোমা নামের ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর ডান ফুসফুসের নিচের অংশ অপসারণের পর ভ্যাটিকান এ তথ্য জানিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুসের এই ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার ভালো সম্ভাবনা থাকে। তবে রোগটি কতটা ছড়িয়েছে, তার ওপর চিকিৎসার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে।
অ্যাডেনোকার্সিনোমা ফুসফুসের ক্যানসারের সবচেয়ে পরিচিত ধরনগুলোর একটি। ধূমপান এর অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ হলেও, যাঁরা কখনো ধূমপান করেননি, তাঁদেরও এই রোগ হতে পারে।
কী এই ফুসফুসের অ্যাডেনোকার্সিনোমা?
অ্যাডেনোকার্সিনোমা এমন এক ধরনের ক্যানসার, যা গ্রন্থিজাত কোষ থেকে তৈরি হয়। এসব কোষ শ্লেষ্মার মতো বিভিন্ন পদার্থ উৎপাদন করে। ফুসফুসে এই ক্যানসার সাধারণত বায়ুথলির আবরণে থাকা কোষে গড়ে ওঠে।
ফুসফুসের ক্যানসারকে প্রধানত কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার বা অপেক্ষাকৃত বড় কোষের ফুসফুসের ক্যানসার মোট আক্রান্তের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। এই শ্রেণির সবচেয়ে প্রচলিত উপধরন হলো অ্যাডেনোকার্সিনোমা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লাং ক্যানসার ফাউন্ডেশন অব আমেরিকার তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুসের মোট ক্যানসারের প্রায় ৪০ শতাংশ এই ধরনের।
সাধারণত ফুসফুসের বাইরের দিকে এই ক্যানসার তৈরি হয়। অন্য কিছু ধরনের ফুসফুসের ক্যানসারের তুলনায় এটি ধীরে বাড়তে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আগেই শনাক্ত করার সুযোগ থাকে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। তবে অ্যাডেনোকার্সিনোমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, যাঁরা কখনো ধূমপান করেননি, তাঁদের মধ্যেও এটি ফুসফুসের ক্যানসারের সবচেয়ে প্রচলিত ধরন।
পোপ লিও ধূমপান করতেন বলে জানা যায়নি। তাঁর ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় ফুসফুসে টিউমারটি ধরা পড়ে। পোপ এর আগে জানিয়েছিলেন, টিউমারটি সীমাবদ্ধ অবস্থায় ছিল এবং প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা হয়েছিল।
কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?
প্রাথমিক পর্যায়ে এই ক্যানসারের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। অন্য কোনো কারণে চিকিৎসা পরীক্ষা বা স্ক্যান করার সময় ঘটনাক্রমে রোগটি ধরা পড়তে পারে।
রোগের অগ্রগতির সঙ্গে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দীর্ঘস্থায়ী কাশি
- শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নেওয়ার সময় সাঁ সাঁ শব্দ
- কাশির সঙ্গে রক্ত বের হওয়া
- বুকে, কাঁধে বা পিঠে ব্যথা
- কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
- দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও দুর্বলতা
এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে ক্যানসার হয়েছে, তা নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কীভাবে চিকিৎসা করা হয়?
ক্যানসার যদি ফুসফুসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে অস্ত্রোপচার রোগটি নিরাময়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি।
পোপ লিওর ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা ডান ফুসফুসের নিচের অংশ অপসারণ করেছেন। এই অস্ত্রোপচারকে বলা হয় লোবেকটমি। এতে ফুসফুসের যে অংশে টিউমার রয়েছে, সেই সম্পূর্ণ খণ্ডটি সরিয়ে ফেলা হয়। টিউমার একটি খণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ক্যানসারযুক্ত টিস্যু অপসারণের পাশাপাশি ফুসফুসের বাকি কার্যক্ষমতা যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
রোগের পর্যায় ও রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ এবং ইমিউনোথেরাপিও দেওয়া হতে পারে। পোপ লিওর পরবর্তী চিকিৎসা সম্পর্কে ভ্যাটিকান এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করে রোগটি কোন পর্যায়ে শনাক্ত হয়েছে এবং ফুসফুসের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তার ওপর।
ভ্যাটিকান এখনো পোপ লিওর টিউমারের আকার কিংবা লসিকাগ্রন্থিতে ক্যানসার ছড়িয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার ফুসফুসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে পাঁচ বছরের আপেক্ষিক বেঁচে থাকার হার প্রায় ৬৭ শতাংশ। আশপাশের টিস্যু বা লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়লে তা প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে আসে। দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে এই হার প্রায় ১২ শতাংশ।
তবে এই পরিসংখ্যান কোনো নির্দিষ্ট রোগীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে বলে না। চিকিৎসায় অগ্রগতির কারণে বর্তমানে রোগ নির্ণয় হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ফলাফল আরও ভালো হতে পারে। টিউমারের আকার, লসিকাগ্রন্থির অবস্থা, বয়স এবং সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতাও চিকিৎসার ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।












