বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহসংকট ২০২৭ সালের অনেকটা সময়জুড়েও অব্যাহত থাকতে পারে। উৎপাদন কমে যাওয়া, সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন এবং শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়ার কারণে জ্বালানিটির মজুত পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত মাসিক তেলবাজার প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ডিজেল উৎপাদনে ধাক্কা, বাড়ছে দাম
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হামলার কারণে শোধনাগারের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ডিজেলের সরবরাহ পরিস্থিতি আরও সংকুচিত হয়েছে। এর প্রভাবে গত সেপ্টেম্বরে অপরিশোধিত তেলের তুলনায় ডিজেল পরিশোধনের মুনাফার ব্যবধান বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলারে পৌঁছায়, যা রেকর্ড পর্যায়ের কাছাকাছি।
আইইএ জানিয়েছে, সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের কারণে শরৎকালে শোধনাগারের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং শীতের সর্বোচ্চ চাহিদার আগেই মৌসুমের স্বাভাবিক প্রবণতার বিপরীতে জ্বালানি মজুত থেকে বড় পরিমাণে তেল ও ডিজেল ব্যবহার করতে হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ বেড়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি কমেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল থেকে এই পরিমাণ সরবরাহ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
মজুত বাড়লেও ঘাটতি পূরণ হবে না
আইইএ আশা করছে, চলতি বছরের শেষ দিকে বিশ্বের শোধনাগারগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। এতে ধীরে ধীরে জ্বালানির মজুত পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে বছরের মধ্যে জমে ওঠা ঘাটতি পূরণের জন্য এই পুনরুদ্ধার যথেষ্ট হবে না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আইইএর সদস্যদেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সমন্বয় করছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ কমানো এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ডিজেল শুধু যানবাহন চালানোর জ্বালানি নয়। কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি তৈরি হলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব
আইইএর সতর্কতা অনুযায়ী, রেকর্ড পর্যায়ের ডিজেলের দাম ইতিমধ্যে অর্থনীতিতে বিস্তৃত প্রভাব ফেলছে। পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।
সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বে মোট তেলের চাহিদা দৈনিক ২৬ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। এই পতনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসবে ডিজেলের চাহিদা থেকে। উচ্চমূল্য ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে জ্বালানির ব্যবহার কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
২০২৭ সালে তেলের সরবরাহ বাড়ার পূর্বাভাস
আইইএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের মোট সরবরাহ দৈনিক ৫৮ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। তবে ২০২৭ সালে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। সে বছর সরবরাহ দৈনিক ৭৭ লাখ ব্যারেল বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি হয়ে উদ্বৃত্ত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে সামগ্রিক তেলের বাজারে সরবরাহ বাড়ার পূর্বাভাস থাকলেও ডিজেলের সংকট দ্রুত কাটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। চলতি বছরের ঘাটতি, শোধনাগারের উৎপাদন পরিস্থিতি এবং শীতকালীন চাহিদার সম্মিলিত প্রভাবের কারণে ২০২৭ সালেও ডিজেলবাজারে চাপ বজায় থাকতে পারে।












