ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ করছেন বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতাকর্মী ও তরুণ আন্দোলনকারীরা। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে সুবিধা পেয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কেন ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক?
ভারতের নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের জুনে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম শুরু করে। পরে তা দেশজুড়ে সম্প্রসারণ করা হয়। প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার নিবন্ধিত ও অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া।
আগে ভোটাররা স্বেচ্ছায় নিজেদের তথ্য সংশোধনের সুযোগ পেতেন। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারের ব্যবহার এবং স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের সীমিত ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এই ব্যবস্থায় স্থানীয় কর্মকর্তারা ভুল তথ্য সংশোধনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে প্রকৃত ভোটারদের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। অনেককে নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করতে পুরোনো নথিপত্র সংগ্রহ করতে হচ্ছে, এমনকি আইনি লড়াইয়েও নামতে হচ্ছে।
দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাবের আশঙ্কা
ভোটার তালিকা সংশোধনে কঠোর নথিপত্রের শর্ত, অল্প সময়ের মধ্যে কাগজপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, অভিবাসী শ্রমিক, বয়স্ক, গৃহহীন ও যাযাবর জনগোষ্ঠীর মানুষ তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
অনেককে নিজের, বাবা-মায়ের, এমনকি দাদা-দাদির পুরোনো নথি খুঁজে বের করতে হচ্ছে। কারও নামের বানান, ভাষান্তর কিংবা তথ্য সংরক্ষণের ভুল সংশোধন করতেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আবার অনেকের কাছে নিজেদের বা বাবা-মায়ের নাম আগের ভোটার তালিকায় থাকার প্রমাণ চাওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন এই দাবির সঙ্গে একমত নয়।
কমিশনের বক্তব্য, বাদ পড়া নামগুলোর বড় অংশ মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার নিবন্ধিত অথবা ভোটার হওয়ার যোগ্যতা হারানো ব্যক্তিদের। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থায় ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্যতা প্রমাণের দায়িত্ব কার্যত নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের প্রধানের দুই সহকর্মী ১০ মাসে ভোটার তালিকা, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি তুলেছিলেন।
কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে বিরোধী কংগ্রেস এবং বিভিন্ন তরুণ সংগঠন বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। তাদের দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করতে হবে।
নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও এর প্রধান নিয়োগে সরকারপক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতাসম্পন্ন কমিটির ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। কমিশন অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্ক
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে। ওই নির্বাচনে বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যটিতে জয় পায়। এর আগে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া অথবা যাচাইয়ের আওতায় আসার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, যোগ্য ভোটারদের বাদ পড়ার কারণে তাঁরা ভোট দিতে পারেননি। তাঁদের দাবি, এর প্রভাব মুসলিম ভোটারদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে এবং বিজেপি রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান কী?
২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম বহাল রাখেন। আদালত বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নাগরিকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই বলেও আদালত স্পষ্ট করেন।
ভোটার তালিকা থেকে নির্বিচারে নাম বাদ দেওয়া এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলগুলো চলতি সপ্তাহে আবারও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
এদিকে ১ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন বাদ পড়া ভোটারদের শনাক্ত করতে এবং তাঁদের পুনরায় তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে।
২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে উদ্বেগ
২০২৭ সালের শুরু থেকে ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশ, যেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম নির্বাচনের আগে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিহারে এক বছরেরও বেশি সময় পরও কয়েকজন ভোটার নিজেদের নাম তালিকায় ফেরানোর জন্য আবেদন ও আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মোদির সরকারের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ভোটার তালিকা নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি তরুণদের ‘ককরোচ’ আন্দোলনও ভারতের রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকারি স্কুলের অবকাঠামো থেকে শুরু করে তরুণদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করেছে সংগঠনটি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনটি চাপ সৃষ্টি করেছিল। পরে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন। এরপরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের দাবিতে মোদি সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে আন্দোলনকারীরা।
এই আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণও বেড়েছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্ক শুধু নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি নাগরিকদের ভোটাধিকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।












