আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ইরিত্রিয়া সীমান্তবর্তী বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি শহরে প্রবেশ করেছে ইথিওপিয়ার সরকারি সেনাবাহিনী। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সীমান্তে সেনা চলাচল এবং তিগ্রে অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী ইরিত্রিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত জালামবেসা শহরে পৌঁছেছে। শহরটি আগে তিগ্রের বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে—এমন চার ব্যক্তি, একজন কূটনীতিক এবং সংঘাত পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত একজন বিশেষজ্ঞসহ ছয়টি সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে।
প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বসবাস জালামবেসা শহরটি ইথিওপিয়ার উত্তর সীমান্তে অবস্থিত। তবে সরকারি সেনারা সেখানে পৌঁছানোর সময় ইরিত্রিয়ার সেনা কিংবা বিদ্রোহীরা শহরে অবস্থান করছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সীমান্তে সেনা প্রবেশ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ইথিওপিয়ার অভিযোগ, ইরিত্রিয়ার সেনারা গত সপ্তাহে সীমান্ত অতিক্রম করে জালামবেসায় প্রবেশ করেছিল এবং তিগ্রের বিদ্রোহীদের সহায়তা দিয়েছিল। তবে ইরিত্রিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইরিত্রিয়ার সরকার বলছে, তাদের সেনারা ইথিওপিয়ায় অনুপ্রবেশ করেনি। বরং দেশটির দাবি, ইথিওপিয়ার পক্ষ থেকে আক্রমণের অভিযোগ তোলা কার্যত যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। জাতিসংঘের কাছে ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে আসমারা।
অন্যদিকে, ইথিওপিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের কাছে পাঠানো চিঠিতে অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়ার সেনারা দেশটির ভূখণ্ডের ভেতরে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে।
দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে মঙ্গলবার আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
তিগ্রেতে আবারও সংঘাত
ইথিওপিয়ায় গত মাসে নতুন করে লড়াই শুরু হয়। তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী জোট সামরিক অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিগ্রে অঞ্চলে চলা যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। দীর্ঘ সংঘাতের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও নতুন করে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু হওয়ায় দেশটিতে আবারও বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযান ইতিমধ্যে কয়েকটি শহর থেকে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছে। জালামবেসায় সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা সেই অভিযানেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শহরটির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি সরকারপন্থী কোনো মিলিশিয়ার মুখপাত্র।
ইথিওপিয়ার সামরিক বাহিনী ও প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের দপ্তর এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেনি।
শান্তিচুক্তির পর আবার মুখোমুখি দুই দেশ
ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া দীর্ঘদিন সংঘাতে জড়িত থাকার পর ২০১৮ সালে শান্তিচুক্তি করে। এরপর ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিগ্রের গৃহযুদ্ধে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে লড়াই করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও অবনতি ঘটে।

বর্তমানে তিগ্রের সংঘাতে দুই দেশ বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোহিত সাগরকেন্দ্রিক উত্তেজনা এবং আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের অন্যান্য সংঘাত। ফলে তিগ্রের লড়াই শুধু ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ
দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পেছনে সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হওয়ার আগে কয়েক দশক ধরে ইথিওপিয়ার সমুদ্র উপকূলে প্রবেশাধিকার ছিল।
বর্তমানে সমুদ্র উপকূলবিহীন ইথিওপিয়া মনে করে, সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার পুনরুদ্ধার করা দেশটির অস্তিত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দেশটির সরকার বলেছে, এ লক্ষ্য অর্জনে শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও সংলাপের পথই অনুসরণ করা হবে।
এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তে সেনা অগ্রযাত্রা এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে কূটনৈতিক তৎপরতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।












