প্রবল এল নিনোর আশঙ্কায় খরা, পানি সংকট ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়েছে ফিলিপাইন। দেশটির পুরোনো ও দুর্বল পানি সরবরাহব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপদেশজুড়ে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
৩০ সেপ্টেম্বর সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’ মোকাবিলায় দেশটির সরকার জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করে। একই সঙ্গে ১০৬টি এলাকায় দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করে জরুরি তহবিল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পুরোনো পানি সরবরাহব্যবস্থায় বাড়ছে উদ্বেগ
ফিলিপাইনের বুলাকান প্রদেশের সান হোসে দেল মন্টে শহরের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত পানির সরবরাহ ও নিম্নমানের পানির সমস্যায় ভুগছেন। কোথাও আগাম ঘোষণা ছাড়াই পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আবার কোথাও দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পানি পাওয়া যায়, যার চাপও থাকে খুব কম।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, নিয়মিত সমস্যার মধ্যেও তাঁদের পানির বিল রাজধানী ম্যানিলার আশপাশের অনেক এলাকার তুলনায় বেশি। এল নিনোর প্রভাবে খরা তীব্র হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। এ কারণে অনেকে আগে থেকেই পানি মজুত করার কথা ভাবছেন।
দেশটির লাখ লাখ পরিবার স্থানীয় সরকার পরিচালিত পানি সরবরাহ সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পুরোনো পাইপলাইন, পানির অপচয়, দূষণের ঝুঁকি এবং পরিশোধনব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নগরায়ণ ও চরম আবহাওয়ার ঘটনাও সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে।
২০২৭ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত থাকতে পারে এল নিনো
ফিলিপাইনের আবহাওয়া সংস্থা প্যাগাসা জানিয়েছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে।
এতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জলাধার আঙ্গাত বাঁধের পানির স্তর কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বাঁধ থেকে বুলাকান অঞ্চলে পানি সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি রাজধানী ম্যানিলার পানযোগ্য পানির ৯০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহের সঙ্গে জলাধারটি যুক্ত।
দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিলে পানির সরবরাহে চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে সেচের পানির অভাবে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তায় ৪৫ বিলিয়ন পেসোর বরাদ্দ
সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ফিলিপাইনের কৃষি বিভাগ ৪৫ বিলিয়ন পেসো বরাদ্দের কথা জানিয়েছে। ডলারের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৭১৭ মিলিয়ন। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে চালের মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
খরা-আক্রান্ত এলাকাগুলোতে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটাতে মেঘে রাসায়নিক ছিটানোর কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে পানিবাহী গাড়ির মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও করছে।
তীব্র গরমের কারণে বন ও ঝোপঝাড়ে আগুন লাগার ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাওয়ের কয়েকটি এলাকায় ইতিমধ্যে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।
খাদ্য, জ্বালানি ও পানির দাম বাড়ার আশঙ্কা
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব এমন সময়ে দেখা দিচ্ছে, যখন ফিলিপাইনের অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জ্বালানি সংকট এবং সরকারি ব্যয় কমে যাওয়ার চাপ সামলাচ্ছে। বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতিও সরকারি ব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।
ফিচ সলিউশন্সের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএমআইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তীব্র এল নিনো দেশটির অভ্যন্তরীণ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। সেপ্টেম্বরে ফিলিপাইনে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছিল। খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি ছিল এর অন্যতম প্রধান কারণ।
ম্যানিলাভিত্তিক চায়না ব্যাংকিং করপোরেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডমিনি ভেলাসকেজ সতর্ক করে বলেছেন, এল নিনো আগামী বছর পর্যন্ত তীব্র থাকলে খাদ্য, জ্বালানি ও পানির সরবরাহ সীমিত হয়ে দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা এই ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। সরবরাহকারী দেশগুলো নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করলে ফিলিপাইনের বাজারে চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
বোতলজাত পানি নিয়ে আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান
খরা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোতলজাত পানির সম্ভাব্য সংকট নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। তবে সরকার অপ্রয়োজনীয়ভাবে পানি কিনে মজুত না করার আহ্বান জানিয়েছে। আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ফিলিপাইন অ্যামালগামেটেড সুপারমার্কেটস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান স্টিভেন কুয়া জানিয়েছেন, বর্তমানে খুচরা বিক্রেতা ও সুপারমার্কেটগুলোতে বোতলজাত পানির সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। উৎপাদক পর্যায়েও সরবরাহের ঘাটতির স্পষ্ট লক্ষণ নেই।
তবে এল নিনো দীর্ঘস্থায়ী হলে পানি সরবরাহের দুর্বল অবকাঠামো, কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভর খাদ্যবাজার—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ফিলিপাইনের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জরুরি ত্রাণ ও খাদ্য মজুতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পানি সরবরাহব্যবস্থার সংস্কারও দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।












