উচ্চ সরকারি ঋণ ও সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধির চাপে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে দ্রুত আর্থিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তাঁর সতর্কবার্তা, সরকারি অর্থব্যবস্থার দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর ঋণের সুদ বৃদ্ধির প্রভাব উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৪ অক্টোবর বুধবার ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জর্জিয়েভা বলেন, আর্থিক ব্যবস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আগেই নীতিনির্ধারকদের জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি রাজস্ব বাড়ানো, ব্যয়ের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকে তিনি অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
সরকারি ঋণ ও বন্ডের সুদে বাড়ছে চাপ
বিশ্ব অর্থনীতিতে সরকারি ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বৈশ্বিক সরকারি ঋণের অনুপাত ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিগত কঠোরতার কারণে ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে তেল ও সারের সরবরাহে বিঘ্ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে এসব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জর্জিয়েভা বলেন, সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধিকে নিছক জল্পনানির্ভর প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনীতির মৌলিক পরিস্থিতির পরিবর্তনই এ বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে। ফলে সরকারগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের চাপ আরও বাড়বে।
জি-৭ দেশের বন্ডের সুদ দুই দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে
আইএমএফের বুধবার প্রকাশিত আর্থিক পর্যবেক্ষণবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি-৭-এর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় সুদের হার ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এতে প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এ হার।
একই সময়ে বড় উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়ায় বাজারে বিপুল পরিমাণ নতুন বন্ড ছাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরকারগুলোর ঋণ সংগ্রহের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঋণমান নির্ধারণ করা হয়েছে এমন ১৪৩টি সার্বভৌম সরকার দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক উৎস থেকে মোট ১৪ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ ঋণ নিতে পারে। ২০২৫ সালের তুলনায় এই পরিমাণ ৫ শতাংশ বেশি এবং ২০২০ সালের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
আইএমএফের হিসাবে, সরকারি অর্থায়নের কার্যকর গড় সুদের হার ২০২১ সালের ২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩১ সালে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সুদের হার বাড়ায় বিশ্বজুড়ে সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাড়তি ঝুঁকি
উন্নত অর্থনীতির সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়লে তার প্রভাব উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোতেও পড়তে পারে। এসব দেশের সরকারকে ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে, বিশেষ করে যেসব দেশে ঋণের বোঝা ও নতুন ঋণের প্রয়োজন আগে থেকেই বেশি।
আইএমএফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর পর এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে শিথিল হয়েছে। বিনিময় হারের সমন্বয়সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ এতে সহায়তা করেছে।
তবে বড় উন্নত অর্থনীতিগুলোতে ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়নের ফলে সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে গেলে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ দ্রুত সুদের হার বাড়ালে ডলারের শক্তি বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে পুঁজি প্রত্যাহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাটতি কমানোর পরামর্শ
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়েও সতর্ক করেছেন জর্জিয়েভা। তাঁর মতে, দেশটির আরও সঞ্চয় করা প্রয়োজন। যেসব দেশে বাজেট ঘাটতি রয়েছে, সেসব দেশের ধীরে ধীরে ঋণ ও ঘাটতি কমানোর পথে এগোনো উচিত।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দেশটির উচ্চ ঋণ ও ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর অনেক বেশি নির্ভর করছে। প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে সহায়তা করলেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সমন্বয় যথেষ্ট দ্রুত নিশ্চিত করতে পারে না।
জর্জিয়েভা আরও সতর্ক করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি একের পর এক ধাক্কা সামলে তুলনামূলক স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে বলে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। মহামারির পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সময় অনেক দেশ ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আর্থিক সুরক্ষা পুনর্গঠন করেনি।
তাঁর মতে, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি মূল্যসংকেত অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।












