ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার জননী’ নামে পরিচিত জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) বোমা এ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে সম্ভাব্য হামলায় এই বোমা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে পরিকল্পনা থাকলেই যে অস্ত্রটি ব্যবহার করা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। কারণ, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হলে তার প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর কার্যক্রম ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
কী এই ‘সব বোমার জননী’?
জিবিইউ-৪৩/বি এমওএবি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা। প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি ওজনের এই বোমাটি বিস্তীর্ণ এলাকায় অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি জিপিএসনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থার সাহায্যে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত হয়।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় ব্যবহারের উপযোগী করে বোমাটি তৈরি করা হয়েছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথমবার এটি ব্যবহার করা হয় ২০১৭ সালের এপ্রিলে, আফগানিস্তানে। সে সময় ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের ব্যবহৃত একটি সুড়ঙ্গ ও গুহার নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে বোমাটি নিক্ষেপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এমওএবিকে সাধারণ বোমার মতো শুধু কোনো নির্দিষ্ট স্থাপনায় আঘাত হানার অস্ত্র হিসেবে দেখা যায় না। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিস্তৃত এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের প্রভাব সৃষ্টি করা। তবে এটি গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংসের জন্য বিশেষভাবে তৈরি গভীর-অনুপ্রবেশকারী বোমা নয়।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে কেন প্রশ্ন?
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনাতেও এমওএবির ব্যবহার বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে পরিচিত একটি স্থাপনাও রয়েছে, যেটি গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানেই অস্ত্রটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি সিএনএনকে জানিয়েছেন, এমওএবির বিস্ফোরণ বিস্তৃত এলাকায় ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারলেও গভীর ভূগর্ভে সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
অর্থাৎ, শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করলেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা সম্ভব হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় অস্ত্রটির সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি দিয়ে বাস্তবে কতটা কৌশলগত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা
ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এমওএবির মতো শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করা হলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে লক্ষ্যবস্তু জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছে অবস্থিত হলে বিস্ফোরণের প্রভাবে আশপাশের স্থাপনা ও মানুষের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা এ ধরনের হামলায় বোমাটির বিস্তৃত বিস্ফোরণ-প্রভাব এবং সম্ভাব্য বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তবে ইরানে এমন কোনো হামলা হয়েছে বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সামরিক পরিকল্পনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য হামলার বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। কিন্তু এসব পরিকল্পনার কোনটি বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর।
সিএনএনকে দেওয়া বক্তব্যে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট সব ধরনের বিকল্প বিবেচনায় রাখছেন। অন্যদিকে, পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য সামরিক বাহিনী বিভিন্ন পরিস্থিতির উপযোগী পরিকল্পনা তৈরি করে থাকে।
এদিকে, সম্ভাব্য হামলায় এমওএবি ব্যবহারের বিষয়ে সিএনএনের প্রতিবেদনটি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। ফলে বোমাটি ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, কিংবা সম্ভাব্য হামলা কবে চালানো হতে পারে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।












