ঢাকার শ্যামপুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত পথের বড় অংশ বা পুরোটাই হবে উড়াল কাঠামোর ওপর। এটি হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের রেলপথের দূরত্ব কমবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার। যাত্রার সময় বাঁচবে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরকারের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এই পরিকল্পনার কথা জানান। ব্রিফিংয়ে লিখিত বিবরণীতেও প্রস্তাবিত ঢাকা-কুমিল্লা উড়াল রেলপথের মূল তথ্য সাংবাদিকদের দেওয়া হয়।
প্রাথমিক হিসাবে প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্মাণে লাগবে চার বছর। গত ৫ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এই প্রাথমিক নকশা ও হিসাব তুলে ধরা হয়। পুরো পথ উড়াল হবে নাকি কিছু অংশ মাটির ওপর দিয়ে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়। কিছু অংশ মাটির বাঁধের ওপর করলে খরচ বেশ খানিকটা কমবে। তবে পুরোটা উড়াল করলে প্রায় ৩২২ একর জমি বাঁচানো যাবে। জমি বাঁচানোর এই হিসাবও সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে, কারণ দেশে কৃষিজমি দ্রুত কমছে।
নকশায় ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ধরা হয়েছে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার। চলাচলের সময় গতি থাকবে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ভবিষ্যতে এই পথে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালানোর সুযোগও রাখা হচ্ছে, যা জ্বালানি খরচ কমাতে পারে। এখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রেন টঙ্গী, ভৈরব ও আখাউড়া ঘুরে কুমিল্লায় পৌঁছায়। এই ঘুরপথের কারণেই সড়কের চেয়ে রেলপথ দীর্ঘ। নতুন সোজা পথ সেই ঘুরপথ এড়িয়ে যাবে। তাই দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত রেল করিডরে যাত্রাসময় কমানোর বড় সুযোগ তৈরি হবে। নতুন পথে ঢাকা-কুমিল্লা উড়াল রেলপথ যুক্ত হলে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান রেললাইন ব্যবহার করা যাবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম পথ দেশের অর্থনীতির প্রধান ধমনি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশের বেশির ভাগ আমদানি-রপ্তানি হয়। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য রেল যোগাযোগ হলে মালামাল পরিবহনের খরচ কমতে পারে। মহাসড়কের ওপর চাপও কিছুটা কমবে। যাত্রীদের জন্যও এটি বড় সুবিধা। কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ কম সময়ে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারবেন। অফিস, চিকিৎসা বা ব্যবসার কাজে দিনে গিয়ে দিনে ফেরাও সহজ হবে। দেশের যাত্রীবাহী ট্রেনে টিকিটের চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে। নতুন পথ চালু হলে বাড়তি ট্রেন চালানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। রেলপথে ভ্রমণ সড়কের চেয়ে নিরাপদ বলেও অনেক যাত্রী ট্রেন বেছে নেন।
তবে প্রশ্নও আছে। প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা এখনো জানানো হয়নি। দেশের অর্থনীতি এখন ঋণ আর ডলারের চাপে আছে। বড় প্রকল্পে খরচ ও সময় বাড়ার অভিজ্ঞতাও মানুষের মনে আছে। জমি অধিগ্রহণ নিয়েও জটিলতা হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাও বড় কাজ। তাই ঢাকা-কুমিল্লা উড়াল রেলপথ বাস্তবে কতটা লাভজনক হবে, সেই হিসাব খোলাখুলি সামনে আসা দরকার। সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের পরেই বোঝা যাবে প্রকল্পটি কোন পথে এগোবে।












