দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বুধবার নয়াদিল্লিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, ভারত আশা করে বাংলাদেশ সরকার এসব বিষয়ের সমাধান করবে এবং দায়িত্বশীলভাবে পরিস্থিতি সামলাবে। পূজার আগে কয়েকটি সংখ্যালঘু সংগঠন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। সেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়েই সাংবাদিকেরা ভারতের অবস্থান জানতে চান।
পূজার মণ্ডপে হামলা বা প্রতিমা ভাঙচুরের আশঙ্কাই উদ্বেগের মূল জায়গা। ভারতের মুখপাত্র সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও নিষ্পত্তির প্রত্যাশার কথাও বলেন। শুক্রবার থেকে দেশে শুরু হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলবে আয়োজন। হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। শহর থেকে গ্রাম, সারা দেশে হাজারো মণ্ডপে পূজা হয়। অন্য ধর্মের মানুষও মণ্ডপে ঘুরতে যান, উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। এই সময়ে মণ্ডপের নিরাপত্তা প্রতিবছরই প্রশাসনের বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
একই ব্রিফিংয়ে আরেকটি প্রসঙ্গ ওঠে। বঙ্গোপসাগর ঘিরে সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেক। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান এর সদস্য। নয়াদিল্লিতে সম্প্রতি বিমসটেক জোটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যাননি। তাঁর অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন করা হয় জয়সওয়ালকে। জবাবে তিনি বৈঠকে গৃহীত দিল্লি ঘোষণার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, ঘোষণায় অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় যৌথ কর্মপরিকল্পনা রাখা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ, সীমান্তপারের মাদক পাচার ও অর্থ পাচার ঠেকাতে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও আছে। তিনি বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে নিরাপত্তা সহযোগিতার ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখান।
ভারতের এ ধরনের মন্তব্য ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন নয়। সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে আগেও বক্তব্য আর পাল্টা বক্তব্য হয়েছে। ঢাকা সাধারণত এসব বিষয়কে দেশের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব হিসেবেই দেখে। প্রতিবছর পূজার সময় পুলিশ, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন মণ্ডপ ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। তবে প্রতিবেশী দেশের প্রকাশ্য প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক চাপ বাড়ায়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা উদ্বেগ তাই শুধু দেশের ভেতরের বিষয় হয়ে থাকছে না। এর প্রভাব পড়ে দুই দেশের বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার আলোচনাতেও। তাই পূজার নিরাপত্তা এখন ঢাকার কূটনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
শেষ পর্যন্ত পূজা কেমন কাটে, সেটাই আসল পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষা শুরু হচ্ছে শুক্রবার। নির্বিঘ্নে উৎসব শেষ হলে বাইরের সমালোচনার জবাব সবচেয়ে ভালোভাবে দেওয়া যাবে। কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া আর দোষীদের বিচারের আওতায় আনাই সবচেয়ে জরুরি। গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টাও ঠেকাতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে যাচাই না করা ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা উদ্বেগ দূর করতে আস্থার পরিবেশ তৈরিই সবচেয়ে কার্যকর পথ। মণ্ডপের আয়োজক, স্থানীয় বাসিন্দা আর প্রশাসনের সমন্বয় এখানে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বরাবরই সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখাই এবারের পূজায় সবার দায়িত্ব।












