কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কয়েক দশক ধরে অমীমাংসিত থাকা গাণিতিক সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে নতুন ওষুধ আবিষ্কার, উন্নত আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং জীবনের মৌলিক রহস্য উন্মোচনেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সঙ্গে দেখা দিয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিজ্ঞানের ফলাফল যদি যন্ত্র তৈরি করে, অথচ মানুষই যদি বুঝতে না পারে সেই ফলাফল কীভাবে এসেছে, তাহলে জ্ঞানের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে?
৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখটি গণিতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ৭০০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। এসব গবেষণায় কয়েক দশক ধরে গবেষকদের ভাবিয়ে তোলা ৩৭২টি গাণিতিক সমস্যার সমাধান বা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করা হয়। এই সাফল্যের তাৎপর্য বুঝতে গণিতবিদেরা এখনো বিশ্লেষণ করছেন।
তবে এর প্রভাব শুধু গণিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এআইয়ের ব্যবহার গবেষণার পদ্ধতি, জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া এবং বিজ্ঞানীদের ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
গাণিতিক গবেষণায় এআইয়ের বড় অগ্রগতি
গণিতে এআইয়ের সাফল্যের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। গণিতের প্রমাণ সাধারণত কিছু স্বীকৃত স্বতঃসিদ্ধ ও যৌক্তিক নিয়মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ফলে উপযুক্ত পদ্ধতিতে এসব প্রমাণ যান্ত্রিকভাবে যাচাই করা সম্ভব।
এ কারণে এআই কোনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান দিলে সেটি সঠিক কি না, তা পরীক্ষা করার সুযোগ থাকে। তবে কোনো সমাধান সঠিক হওয়া আর মানুষ সেই সমাধানের পেছনের যুক্তি পুরোপুরি বুঝতে পারা এক বিষয় নয়।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন বিতর্ক। এআই যদি এমন জটিল প্রমাণ তৈরি করে, যা মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন, তাহলে সেই সমাধান গণিতের জ্ঞানকে কতটা এগিয়ে নেবে?
গণিতবিদদের একাংশের মতে, গণিতচর্চার প্রকৃত মূল্য শুধু সঠিক উত্তর পাওয়ার মধ্যে নেই। সমস্যাটি নিয়ে দীর্ঘ সময় চিন্তা করা, যুক্তি তৈরি করা এবং প্রমাণের প্রতিটি ধাপ বোঝার মধ্য দিয়েই মানুষের গাণিতিক জ্ঞান সমৃদ্ধ হয়।
গণিত ছাড়িয়ে আবহাওয়া, উপাদান ও পারমাণবিক সংযোজন গবেষণায় এআই
পরীক্ষা-নিরীক্ষানির্ভর বিজ্ঞানেও এআইয়ের অবদান দ্রুত বাড়ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নত করা, নতুন উপযোগী উপাদান খুঁজে বের করা এবং নিউক্লিয়ার ফিউশন বা পারমাণবিক সংযোজন পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণে এআই ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রোটিনের গঠন অনুমানেও এআই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এনেছে। অ্যামিনো অ্যাসিডের বিন্যাস থেকে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার এই সক্ষমতা জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রোটিনের গঠন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এআইভিত্তিক গবেষণার অবদান নোবেল পুরস্কার অর্জনেও ভূমিকা রেখেছে।
এসব উদাহরণ দেখাচ্ছে, এআই কেবল তথ্য বিশ্লেষণ বা গবেষকদের সহায়তা করার যন্ত্র নয়। এটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের গতি বাড়ানো এবং আগে কঠিন বলে বিবেচিত সমস্যার সমাধান খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে।
জীববিজ্ঞানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে জীববিজ্ঞান। গবেষকেরা ইতিমধ্যে খরা সহ্য করতে পারে এমন ফসলের নকশা তৈরি, নতুন ওষুধের সন্ধান এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে এমন ভাইরাস নিয়ে গবেষণায় এআই ব্যবহার করছেন।
একই সঙ্গে কোষ কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য কম্পিউটারভিত্তিক মডেল তৈরির প্রচেষ্টাও চলছে। কোষের ভেতরের জটিল প্রক্রিয়াগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে অনুকরণ করা সম্ভব হলে বিজ্ঞানীরা জীবনের মৌলিক কার্যক্রম সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পেতে পারেন।
দীর্ঘমেয়াদে এই অগ্রগতি জীববিজ্ঞানের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে। এমনকি সম্পূর্ণ নতুন জীবের নকশা তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে, যদিও সে পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য এখনো বড় বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ডিএনএর মতো জৈবিক উপাদানকে তথ্য ও নির্দেশনার একটি জটিল ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ আরও বাড়বে। তবে জীবন্ত ব্যবস্থার জটিলতা এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে।
এআইয়ের সাফল্যে গণিতবিদদের উদ্বেগ
এআইয়ের এই অগ্রগতি সবাইকে সমানভাবে আশাবাদী করছে না। অনেক গণিতবিদ মনে করছেন, যন্ত্রের তৈরি প্রমাণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও বোঝার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
৯০০ জনের বেশি গবেষকের প্রতিনিধিত্বকারী অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান ম্যাথমেটিকসের বক্তব্যেও এই উদ্বেগ উঠে এসেছে। সংগঠনটির মতে, গণিতবিদেরা এ ধরনের কাজ সম্পন্ন করার জন্য এআইকে অনুরোধ করেননি।
তাঁদের যুক্তি, গণিতের প্রকৃত মূল্য শুধু প্রমাণ হাতে পাওয়ায় নয়; বরং সেই প্রমাণ খুঁজে বের করার কঠিন প্রক্রিয়ায়। কারণ এই পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই নতুন ধারণা তৈরি হয় এবং মানুষের বোঝাপড়া গভীর হয়।
শিক্ষার্থীদের হাতে কোনো সমস্যার উত্তর তুলে দেওয়ার সঙ্গে বিষয়টির তুলনা করা যায়। উত্তর সঠিক হলেও সমাধানের পদ্ধতি না বুঝলে শেখার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তবে এই আপত্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের অধিকার শুধু কোনো নির্দিষ্ট পেশাজীবী গোষ্ঠীর নয়। এআই যদি এমন সমস্যার সমাধান করতে পারে, যা মানুষের পক্ষে দীর্ঘ সময়েও সমাধান করা কঠিন, তাহলে সেই অগ্রগতি গ্রহণ করার সুযোগ থাকা উচিত।
প্রতিটি বৈজ্ঞানিক ফলাফলের পেছনের সব প্রক্রিয়া পুরোপুরি বোঝা সব সময় সম্ভবও নয়। মানুষ অনেক কার্যকর প্রযুক্তি ও চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করে, যেগুলোর কার্যপ্রণালির প্রতিটি দিক এখনো সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায়নি। তাই শুধু মানুষের বোধগম্যতার সীমার মধ্যে জ্ঞানকে আটকে রাখাও যুক্তিসংগত নয়।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: বিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে বড় এআই প্রতিষ্ঠানের হাতে
এআইয়ের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পেছনে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু মানবকল্যাণের জন্য গবেষণা করছে না; বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে পারলে এআই মডেল আরও দক্ষ ও বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারে।
কিছু গবেষকের ধারণা, বিজ্ঞানভিত্তিক সমস্যা সমাধানে উন্নতি করা মডেল অন্যান্য কাজেও আরও সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। এমনটি ঘটলে উন্নত এআই তৈরির সক্ষমতা অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভবিষ্যতে এসব মডেল নিজেদের উন্নত করার কাজে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে রোবট কিংবা সরাসরি গবেষণাগারের যন্ত্রপাতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বাস্তব পরীক্ষাও পরিচালনা করতে পারে।
কিন্তু কোনো এআই কী করছে, কেন করছে এবং তার ফলাফল কী হতে পারে—এসব বিষয়ে মানুষ যদি যথেষ্ট ধারণা না রাখে, তাহলে তাকে গবেষণার জন্য অর্থ ও অন্যান্য সম্পদ দিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এআইকে মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার প্রচেষ্টা থাকলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়। মানুষ যদি বিজ্ঞানসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ক্রমাগত যন্ত্রের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ কতটা বজায় থাকবে?
মানুষের তত্ত্বাবধান ছাড়া নয় এআইনির্ভর বিজ্ঞান
এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে এআইয়ের কার্যক্রম ও ফলাফল যাচাই করার মতো সক্ষমতা মানুষের হাতে থাকা প্রয়োজন।
গবেষণাগার, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এমন ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত, যাঁরা এআইয়ের কাজ সম্পর্কে অবগত থেকে তার যৌক্তিকতা বিচার করতে পারবেন।
এতে গবেষণার গতি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু এআইয়ের কার্যক্রম মানবস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করতে এই তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীদের ভূমিকাও বদলাতে হবে। ভবিষ্যতে শুধু নিজেরা গবেষণা করা নয়, এআইকে সঠিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া, তার তৈরি ফলাফল পরীক্ষা করা এবং অন্যদের কাছে সেসব ফলাফল ব্যাখ্যা করাও গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে এসব কাজে অবদান রাখা বিজ্ঞানীদের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। গবেষণায় অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এআই পরিচালনা, ফলাফল যাচাই এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মতো কাজকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত গবেষণার পদ্ধতি ও কোড প্রকাশ করা এবং নিজেদের কাজকে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা। এতে ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা সহজ হবে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
ফলাফল যাচাইয়ের সংস্কৃতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে
এআইয়ের তৈরি গবেষণার ফলাফল পরীক্ষা করা হয়তো নতুন কোনো আবিষ্কারের মতো আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু বিজ্ঞানকে নির্ভরযোগ্য রাখতে এই কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানব গবেষণায়ও ভুল, দুর্বল যুক্তি এবং পুনরুৎপাদন করা যায় না—এমন ফলাফলের সমস্যা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্যের গবেষণা যাচাই করার কাজ যথেষ্ট স্বীকৃতি পায় না। ফলে ভুল শনাক্ত ও সংশোধনের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হতে পারে। যন্ত্র দ্রুত বিপুলসংখ্যক ফলাফল তৈরি করতে পারলেও সেগুলো সঠিক, কার্যকর এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে তাই সন্দেহ, যাচাই এবং স্বাধীন পর্যালোচনার চর্চা আরও শক্তিশালী করতে হবে। কোনো ফলাফল শুধু উন্নত প্রযুক্তি থেকে এসেছে বলেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
১৭ শতকে প্রতিষ্ঠিত রয়্যাল সোসাইটির বিখ্যাত নীতিবাক্য Nullius in verba—অর্থাৎ কারও কথাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস নয়—এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এআইয়ের তৈরি বৈজ্ঞানিক ফলাফলের ক্ষেত্রেও এই নীতি অনুসরণ করতে হবে।
বিজ্ঞানে এআইয়ের অগ্রগতি মানবজাতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। তবে সেই অগ্রগতির প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে শুধু কত দ্রুত নতুন আবিষ্কার হচ্ছে তার ওপর নয়, মানুষ কতটা সেই আবিষ্কার যাচাই করতে পারছে, বুঝতে পারছে এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারছে তার ওপরও।
এআই বিজ্ঞানকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানের লক্ষ্য ও দিকনির্দেশ নির্ধারণে মানুষের ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।












