‘প্যান্ডেলের অবস্থা খুব খারাপ, ভেঙে পড়তে পারে, দয়া করে চলে যান’—মাইকে এমন একটি ঘোষণা থেকেই কলকাতার দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। রোববার পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ভিড় নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনা, বিভ্রান্তিকর ঘোষণা এবং বৃষ্টির মধ্যে দর্শনার্থীদের আকস্মিক চাপকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সারাক্ষণ রিপোর্ট
ঘোষণার ভিডিও পরীক্ষা করছে পুলিশ
প্যান্ডেল ভেঙে পড়তে পারে বলে দর্শনার্থীদের সতর্ক করে মাইকে দেওয়া ঘোষণার একটি ভিডিও পুলিশের হাতে এসেছে। কলকাতা পুলিশ ভিডিওটি পরীক্ষা করছে। কে ওই ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং কী কারণে এমন সতর্কবার্তা প্রচার করা হয়েছিল, তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, সপ্তমীর উদ্যাপনের সময় বৃষ্টি থেকে আশ্রয় নিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্যান্ডেলের দিকে আসেন। এর সঙ্গে দুর্বল ভিড় ব্যবস্থাপনা ও বিভ্রান্তিকর ঘোষণা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
প্রবেশপথ সরু, বের হওয়ার নির্দেশনায় ঘাটতি
পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্যান্ডেলের প্রবেশপথ ও সেখানে যাওয়ার সড়ক ছিল সরু। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর দর্শনার্থীরা প্রবেশপথ দিয়েই বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে ভিড়ের চাপ আরও বেড়ে যায় এবং পদদলনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
প্রবেশ, বের হওয়া ও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত নির্দেশনা ছিল না বলেও জানিয়েছে পুলিশ। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী সামলানোর জন্য আয়োজকদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না; অধিকাংশ ব্যবস্থাপনাই মৌখিক নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ
তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও রেকর্ড করা হয়েছে। ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে আহত ও বেঁচে যাওয়া দর্শনার্থীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
প্যান্ডেলে পুলিশের পর্যাপ্ত সদস্য এবং বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শনিবার রাতে ঘটনাস্থলে ফরেনসিক দল আলামত সংগ্রহ করেছে। পরবর্তী পর্যায়েও সেখানে পরীক্ষা চালানোর কথা রয়েছে।

নিরাপত্তা জোরদার, ক্ষতিপূরণ ঘোষণা
ঘটনার পর কলকাতা পুলিশ কমিশনার অজয় কুমার নন্দ প্যান্ডেলসংলগ্ন সড়কগুলোতে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
রাজ্য সরকার নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজন সদস্যকে গ্রুপ ডি পদে সরকারি চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি বড় দুর্গাপূজার প্যান্ডেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং ঘাটতি পাওয়া গেলে দ্রুত সংশোধনের সুপারিশ করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আহতদের চিকিৎসা চলছে
আহত ২৫ জনের মধ্যে রোববার ১৪ জন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ বসু জানান, আইসিইউতে থাকা একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্য দুজনের শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল।
দুর্ঘটনার পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
কলকাতার চোরবাগান দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্যান্ডেল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে মাইকে দেওয়া ঘোষণা আতঙ্ক ছড়িয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ভিড় নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনার অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
কলকাতার দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু। বিভ্রান্তিকর ঘোষণা, সরু প্রবেশপথ ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি—দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিশ।












