ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আঘাত এবং সীমান্তজুড়ে সংঘাতের বিস্তারে চাপে পড়েছে দেশটির সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সৌদি নেতৃত্বকে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, নাকি হুতিদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো।
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যস্ত। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কমেছে ৫৮ শতাংশ। বিদেশি সহায়তা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বহু পরিবারের। পাঁচ বছরের কম বয়সী ২০ লাখের বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। এত সংকটের মধ্যেও হুতি বিদ্রোহীরা তাদের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ জনবসতিপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা হুতিরা এখন সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে সৌদি আরবের ক্ষতির পরিমাণ বিদ্রোহীদের তুলনায় অনেক বেশি হবে। কারণ, সৌদি সরকারের সামনে শুধু সামরিক নিরাপত্তা নয়, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যও রয়েছে।
রিয়াদে হামলা, বিপর্যস্ত বিমান চলাচল
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে হুতিরা। রিয়াদের বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ১৩ অক্টোবর পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরেও হামলা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১০ অক্টোবর রিয়াদের বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। টার্মিনালটি মূলত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আহত ও নিহতদের মধ্যে মক্কাগামী কিছু ধর্মপ্রাণ যাত্রীও ছিলেন। জেদ্দা শহর মুসলমানদের পবিত্রতম ধর্মীয় স্থানগুলোতে যাওয়ার অন্যতম প্রবেশদ্বার।
সৌদি আরবের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ও প্যাট্রিয়টের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠেকানো সম্ভব হলো না কেন, তা স্পষ্ট নয়।
দীর্ঘদিনের সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সরঞ্জামের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি হুতিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলার কৌশল নিচ্ছে। হামলার সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অ্যালার্ট ব্যবস্থা সম্প্রতি বন্ধ করে দিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত সতর্কবার্তায় মানুষ বিরক্ত হচ্ছিল—এমন কারণ দেখানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিমানবন্দরে হামলার পর সতর্কবার্তা ব্যবস্থা আবার চালু করা হয়।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে চাপ
রিয়াদের বিমানবন্দর অন্তত ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। অন্য বিমানবন্দরগুলো চালু থাকলেও জেদ্দা ও দাম্মামে ফ্লাইটগুলোকে দীর্ঘ সময় আকাশে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে ওই এলাকাগুলোতেও নিরাপত্তাঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি বিদেশি বিমান সংস্থা সৌদি আরবগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। ইউরোপের বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংস্থাও সৌদি আকাশসীমার বড় একটি অংশ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ১১ অক্টোবর রিয়াদে শুরু হওয়ার কথা ছিল বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কংগ্রেস। কিন্তু কয়েকটি বড় তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে অংশগ্রহণ বাতিল করেছেন।
অন্যদিকে, ২৬ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনকে প্রায়ই ‘মরুভূমির দাভোস’ বলা হয়। এতে বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদদের অংশ নেওয়ার কথা। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এবারের আয়োজন হাইব্রিড পদ্ধতিতে হতে পারে, যেখানে অনেক অতিথি অনলাইনে যুক্ত হবেন।
এই পরিস্থিতি সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতকে শক্তিশালী করা। গত বছর সৌদি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল রিয়াদ এয়ার নামে নতুন একটি বিমান সংস্থা চালু করে। কিন্তু নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সংস্থাটির উড়োজাহাজগুলোকে সতর্কতামূলকভাবে রিয়াদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীর আর্থিক এলাকার কর্মীদেরও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাসা থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত বাহিনী কেন পিছিয়ে
ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হুতিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে শক্তিশালী করা। তবে বাস্তবে সেই সরকারের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল। ২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি দায়িত্ব নেন। সরকারের অনেক মন্ত্রী দীর্ঘ সময় রিয়াদে অবস্থান করেন, আর ইয়েমেনের নিয়মিত সেনাবাহিনীর কার্যকর উপস্থিতিও সীমিত।
২০১৫ সাল থেকে হুতিবিরোধী বাহিনী বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত। তাদের মধ্যে রয়েছে ইসলামপন্থী সংগঠন, উপজাতীয় বাহিনী এবং দক্ষিণ ইয়েমেনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। এসব গোষ্ঠীর কেউ সৌদি আরবের, কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সমর্থন পেয়েছে।
ইউএই-সমর্থিত বাহিনীগুলোকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর মনে করা হতো। কারণ, ইউএই সম্মুখসারিতে বিশেষ বাহিনীর সদস্য পাঠিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিত। অন্যদিকে, সৌদি আরব দূর থেকে যুদ্ধ পরিচালনায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
গত বছর সৌদি আরব ও ইউএই-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়। ইউএই-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সৌদি-সমর্থিত শিবিরের কাছ থেকে কিছু এলাকা দখল করে নেয়। এর পর ইউএইকে তার বাহিনী প্রত্যাহার করতে হয়। ফলে ইয়েমেনে সৌদি আরব তার অন্যতম কার্যকর মিত্রকে হারায়।
এর প্রভাব পড়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। হুতিরা যখন মোখা বন্দরের দিকে অগ্রসর হয়, তখন তাদের প্রতিপক্ষের কয়েকটি বাহিনী পিছু হটে। সৌদি আরব যদি আগের মতো দূর থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করে, তাহলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
পাকিস্তান ও তুরস্কের সহায়তা চায় সৌদি আরব
যুদ্ধের চাপ সামাল দিতে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি সামনে এনেছে। পাকিস্তান কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইসলামাবাদ জানিয়েছে, এসব সেনাকে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে পাঠানো হয়নি।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্প এখনো তাতে সম্মতি দেননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের হামলার পরও হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি দুর্বল করা যায়নি। ফলে শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে তাদের পরাজিত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সমঝোতার পথে গেলে কী হবে
সৌদি আরবের সামনে আরেকটি পথ হলো কূটনৈতিক সমঝোতা। ২০২২ সাল থেকে হুতিদের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে রিয়াদ। কিন্তু সমঝোতা যখনই কাছাকাছি এসেছে, তখনই হুতিরা নতুন শর্ত দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হুতিরা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী মনে করছে। তাই তারা বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক সুবিধা এবং ইয়েমেনে নিজেদের শাসনের স্বীকৃতি চাইতে পারে। সৌদি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এখন বড় ধরনের ছাড় দিলে ভবিষ্যতে হুতিরা আরও দাবি নিয়ে হাজির হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে সৌদি আরবের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন—এমন কয়েকজনের ধারণা, রিয়াদ হয়তো মাঝামাঝি একটি পথ বেছে নিতে পারে। প্রথমে মোখা বন্দর পুনর্দখলের চেষ্টা, এরপর শান্তি আলোচনায় যাওয়া হতে পারে সেই কৌশলের অংশ।
তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করছে হুতিদের সিদ্ধান্তের ওপরও। তারা যদি তাইজ শহর ঘিরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং একই সঙ্গে রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তাদের ওপর চাপ কমে যেতে পারে।
সৌদি আরবের সামনে কঠিন সমীকরণ
ইয়েমেনের যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, বিমান চলাচল, পর্যটন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্ন।
দীর্ঘ যুদ্ধ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, হুতিদের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতা করলে ভবিষ্যতে আরও চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সামরিক অভিযান ও কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন রিয়াদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।












