ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রোববার, ১৮ অক্টোবর, নেতানিয়াহুকে পুনর্নির্বাচিত করার পক্ষে নিজের অবস্থান জানান তিনি। ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য এবং ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর জোটের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ট্রাম্পের এই সমর্থন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত এক বার্তায় নেতানিয়াহুকে ‘শক্তিশালী, সাহসী ও অসাধারণ’ নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। ইসরায়েলের জনগণের উদ্দেশে লেখা ওই বার্তায় তিনি নেতানিয়াহুর প্রতি নিজের পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের অংশগ্রহণের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রবল বিরোধিতা ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নেতানিয়াহু নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, প্রতিকূলতা নেতানিয়াহুকে দুর্বল করার পরিবর্তে আরও দৃঢ় করেছে।
জবাবে নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দুই দেশ একসঙ্গে তাদের লক্ষ্য পূরণ করবে।
নির্বাচনের আগে কেন গুরুত্বপূর্ণ ট্রাম্পের সমর্থন
ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা। তবে আসন্ন নির্বাচনে তাঁর ডানপন্থী লিকুদ পার্টি ও ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী জোটের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে, ক্ষমতাসীন জোট পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর পক্ষেও সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন একত্র করা কঠিন হতে পারে।
ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। পার্লামেন্টে আসনসংখ্যা এবং বিভিন্ন দলের সঙ্গে জোট গঠনের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সরকার গঠিত হয়। ফলে কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে পারে।
এ অবস্থায় ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থন নেতানিয়াহুর প্রতি দ্বিধায় থাকা কিছু ভোটারকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এর মাধ্যমে ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ওয়াশিংটনভিত্তিক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলারের মূল্যায়ন, নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য ক্ষতিকর হওয়ার সম্ভাবনা কম; বরং কিছুটা সুবিধা দিতে পারে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ হলেও তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন চাপের মুখে ফেলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানবিরোধী যুদ্ধের সপ্তম মাস চলছে। এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমতও নেতিবাচক। আগামী ৩ নভেম্বর দেশটিতে কংগ্রেস নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ট্রাম্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সময়ে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের সমালোচকদের মধ্যেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক তামার হারমানের মতে, ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর কিছু অনিশ্চিত ভোটারকে তাঁর পক্ষে ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে এই সমর্থন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ইসরায়েলের ভোটারদের প্রতিক্রিয়ার ওপর।

ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিক প্রশ্ন
বিদেশি দেশের নির্বাচনে প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত রাজনৈতিক রীতির তুলনায় ব্যতিক্রমী। এর আগে তিনি হাঙ্গেরি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, জাপান ও হন্ডুরাসের নির্বাচনী রাজনীতিতেও বিভিন্ন প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার আগে ট্রাম্প একাধিকবার এমন ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। বিশ্লেষক মিলারের মতে, গাজা ও লেবাননসহ বিভিন্ন ইস্যুতে নেতানিয়াহুর ওপর নিজের প্রভাব কতটা কাজে লাগানো যায়, তা বিবেচনা করে ট্রাম্প আগে সিদ্ধান্ত না-ও নিয়ে থাকতে পারেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মিলারের বিশ্লেষণে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের অসন্তোষ থাকলেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের রাজনৈতিক বিবেচনাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। নেতানিয়াহুকে সমর্থন না দিলে ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্ন উঠতে পারত।

নেতানিয়াহুর সামনে কী পরিস্থিতি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে লেবানন ও ইরানকে ঘিরেও সংঘাত বিস্তৃত হয়। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা, সামরিক নীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্কের ভবিষ্যতের সঙ্গেও যুক্ত।
নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন, নাকি মধ্যপন্থী বিরোধী নেতাদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হবে—তা নির্ধারণে পার্লামেন্টের আসনবণ্টন ও সরকার গঠনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যদি কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠন কিংবা আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন এই নির্বাচনে একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের ভোটারদের সিদ্ধান্ত, দলগুলোর আসনসংখ্যা এবং নির্বাচনের পর সম্ভাব্য জোট-সমীকরণই নির্ধারণ করবে দেশটির পরবর্তী সরকার কোন পথে এগোবে।












