জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, সরকারি সেবার মান কমে যাওয়া এবং আবাসনসংকটকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ফ্রান্স, ইতালি ও আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকে ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়ার ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে বিভিন্ন শহরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইউরোপের বিভিন্ন শহরে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এসব বিক্ষোভে তরুণদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁদের অভিযোগ, আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না জীবনযাত্রার মান। ফলে বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সমাজবিজ্ঞানী মারিয়া সিলভেস্ত্রে মনে করেন, ইউরোপের তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নিজেদের পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি বাড়ছে। বিভিন্ন সমস্যা একসঙ্গে জমতে জমতে একসময় তা বড় ধরনের আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে ব্যাপক বিক্ষোভ
ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই বিক্ষোভে পরে শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য অধিকারকর্মীরাও যুক্ত হন। একপর্যায়ে আন্দোলনের পরিধি বাড়িয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদ জানানো হয়।
১৭ অক্টোবর দেশটির বিভিন্ন শহরে বড় আকারের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বহু মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নিলেও কিছু এলাকায় পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ ও বোর্দোতে দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ১৯ শতকে নির্মিত সিটি হলের একটি অংশে আগুন ধরে যায়। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভের সময় পুলিশ ও সংঘর্ষে জড়ানো ব্যক্তিদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এতে বহু মানুষ আহত হন এবং বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, যারা লুটপাট করেছে, তাদের ক্ষয়ক্ষতির দায় নিতে হবে। সরকারি স্থাপনা ও পুলিশের ওপর হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।
স্পেন ও পর্তুগালে আবাসনসংকট বড় সমস্যা
স্পেনে তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ বাড়িভাড়া ও আবাসনের ব্যয়। রাজধানী মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় পুয়ের্তা দেল সল এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। শহরটির পাশাপাশি স্পেনের অন্যান্য এলাকাতেও আবাসনসংকট নিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশটিতে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১ হাজার ২২১ ইউরো। অন্যদিকে ৮০ বর্গমিটারের একটি অ্যাপার্টমেন্টের গড় মাসিক ভাড়া প্রায় ১ হাজার ১৩০ ইউরো। ফলে ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করা মানুষের পক্ষে ভাড়া পরিশোধের পর খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
মাদ্রিদের ২০ বছর বয়সী এক রেস্তোরাঁকর্মী জানান, তাঁর বেতনের বড় অংশই বাড়িভাড়ায় চলে যায়। তাঁর মতো অনেক তরুণকে প্রতিদিনের খরচ চালাতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
শিক্ষকদের বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়েও স্পেনে অসন্তোষ রয়েছে। মাদ্রিদে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গত সপ্তাহে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন। তাঁদের দাবি, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি কাজের পরিবেশের উন্নতি করতে হবে।
আবাসনসংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া কিছু উদ্যোগ সংসদে সমর্থন না পাওয়ায় রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নভেম্বরে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সময়ে সাধারণ ধর্মঘটেরও ডাক দেওয়া হয়েছে।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবন ও বন্দরনগরী পোর্তোতেও বাড়িভাড়া, বন্ধকী ঋণের কিস্তি, কম মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ চলছে। শ্রমিক সংগঠন ও আবাসন অধিকারকর্মীরা বেতন বৃদ্ধি, উন্নত পেনশন এবং সাশ্রয়ী আবাসনের দাবি জানিয়েছেন।
ইতালিতে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি সেবা নিয়ে ক্ষোভ
ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন এবং বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ইতালির মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এই চাপ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করেছে।
শান্তিপূর্ণ মিছিলের পর তুরিন, বোলোনিয়া ও মিলানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। মিলানে মুখোশ পরা কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান, দোকানপাটে লুটপাট করেন এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মিলানে দুই দিনের অস্থিরতায় ২৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৪ সদস্য আহত হন।
এ পরিস্থিতিতে ‘অক্টোবর ১৭ আন্দোলন’ নামে একটি নতুন সংগঠন ইতালির বিভিন্ন শহরে প্রতি শনিবার ধারাবাহিক বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভও তীব্র হয়েছে। টানা কয়েক দিন ধরে চলা আন্দোলনে উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
‘ফ্লেমিংগো’ আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন। তাঁদের প্রধান অভিযোগ দুর্নীতি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পেনশনব্যবস্থার সুরক্ষার দাবিও জানানো হয়েছে।
আলবেনিয়ার একটি এলাকায় বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি দেওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সংশ্লিষ্টতা থাকায় বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেও পরিণত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী রামা বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করে তাঁদের উগ্রপন্থীদের দ্বারা প্রভাবিত বলে মন্তব্য করেছেন। তবে আন্দোলনকারীরা দুর্নীতির অবসান ও জনসেবা খাতের সুরক্ষাকে তাঁদের মূল দাবি হিসেবে তুলে ধরছেন।
সার্বিয়ায় তরুণদের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন
বলকান অঞ্চলের আরেক দেশ সার্বিয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এবার দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তরুণদের সমর্থনপুষ্ট একটি রাজনৈতিক শক্তি।
২৫ অক্টোবরের নির্বাচনের পর ভুচিচ আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ দলও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ কি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াবে?
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান বিক্ষোভের কারণ এক নয়। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, কোথাও আবাসনসংকট, আবার কোথাও দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি। তবে এসব সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে উদ্বেগ।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে স্থায়ী কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী বাসস্থান ও মানসম্মত সরকারি সেবা পাওয়ার অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাঁদের অনেকের কাছে প্রচলিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না।
এদিকে ইউরোপের কয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রয়েছে। জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী সমর্থন বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্য দেশেও একই ধরনের রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ার আলোচনা চলছে। সামাজিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে এসব দল নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পাশাপাশি সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে বিক্ষোভের সঙ্গে অভিবাসীদের সরাসরি দায়ী করার মতো বক্তব্যের পক্ষে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের পক্ষ থেকে প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের ব্যয়সংকট, আবাসনের অভাব, শিক্ষার মান ও সরকারি সেবার দুর্বলতা মোকাবিলা করা। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে জনঅসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।












