গত তিন দশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রগতি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সৌর ও বায়ুশক্তির প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে এবং বহু দেশে প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এসব উৎসের ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়েছে। জার্মানি ও ডেনমার্কের মতো উন্নত অর্থনীতিতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অবকাঠামো সম্প্রসারিত হয়েছে। এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রসার ঘটেছে। পাকিস্তানের শহর থেকে প্রত্যন্ত কৃষিপ্রধান অঞ্চল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুতের বিস্তার এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
এই অগ্রগতি শুধু পরিবেশ সুরক্ষার সম্ভাবনা তৈরি করেনি; বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিকেন্দ্রীকরণ করে জ্বালানির ওপর জাতীয় নির্ভরতাও কমানোর সুযোগ দিয়েছে। একসময় জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও প্রচলিত জ্বালানি খাতের প্রভাবের কারণে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন ছিল, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি সেগুলোর অনেক বাধা অতিক্রম করেছে। ফলে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সৌর ও বায়ুশক্তির বিস্তার শেষ পর্যন্ত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিকে ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৫ সালের পূর্বাভাসও এই আশাবাদকে শক্তি জুগিয়েছে। সংস্থাটি বলেছিল, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ গিগাওয়াট বাড়তে পারে। এই পরিমাণ চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সমতুল্য।
কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যত দ্রুত হয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তবতা ততটা সরল নয়। নবায়নযোগ্য শক্তির বিস্তারকে অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থা থেকে সরে আসা কেবল সময়ের ব্যাপার। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত এই ধারণার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।

ভূরাজনীতি বদলে দেয় জ্বালানির হিসাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছানো এবং হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসার পর জ্বালানির বৈশ্বিক রাজনীতিতে পুরোনো বাস্তবতা আবার স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব কোনো একটি অঞ্চল বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বিশ্ববাজার, সরবরাহব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিও এর চাপে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌর ও বায়ুশক্তির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার চেয়ে তাৎক্ষণিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি সরকারের কাছে বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা সংকটের মুহূর্তে সব দেশের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এখানে সমস্যাটি নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস পরিবর্তন করলেই কি একটি দেশ তার সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে? শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এখনো ব্যাপক। ফলে সৌর ও বায়ুশক্তির সক্ষমতা বাড়লেও তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার অর্থনৈতিক অভিঘাত থেকে বিশ্ব পুরোপুরি মুক্ত নয়।
এই বাস্তবতা দেখায়, নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত বিস্তার এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস—দুটি সম্পর্কিত হলেও এক নয়। প্রথমটি অর্জন করা সম্ভব প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে। দ্বিতীয়টির জন্য অর্থনীতির বিভিন্ন খাত, অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রের নীতিতে আরও গভীর পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রযুক্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ
জ্বালানি রূপান্তরের আলোচনায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে প্রায়ই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কোনো প্রযুক্তি কত দ্রুত বিস্তার লাভ করবে, তা নির্ভর করে সরকারের সিদ্ধান্ত, অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকারের ওপরও।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সৌর প্যানেল বা বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চয়, সঞ্চালন ও বিতরণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিদ্যমান জ্বালানি অবকাঠামোর সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার সমন্বয় করতে হয়।
সরকারের ভূমিকা এখানে কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বাধা নয়। জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, জাতীয় শিল্পের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক সংকটের ঝুঁকি বিবেচনা করে নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। রাজনৈতিক আদর্শ বা পরিবেশগত লক্ষ্য তখনই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয়, যখন সেগুলো অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটের শিক্ষা হলো, জ্বালানি ব্যবস্থাকে শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো দেশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়িয়েও যদি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে তার জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের নতুন সংজ্ঞা দরকার
জ্বালানি রূপান্তরকে ন্যায্য করার ধারণাটিও নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি। এই রূপান্তর কেবল নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য আলাদা একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করে এবং প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে অর্জন করা যাবে না। কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে বিদ্যমান শিল্প, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
প্রচলিত ব্যবস্থাকে এক ধাপে সরিয়ে দিয়ে তার পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং পুরোনো ও নতুন ব্যবস্থার মধ্যে সহযোগিতা, বিনিয়োগের সমন্বয় এবং ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মাধ্যমেই কার্যকর রূপান্তর সম্ভব।
এর অর্থ এই নয় যে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য পরিত্যাগ করতে হবে। বরং সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ নির্ধারণে বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করতে হবে। কোন খাতে কত দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব, কোথায় বিকল্প প্রযুক্তি প্রস্তুত এবং কোন অবকাঠামো দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজন হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণের লক্ষ্য ঘোষণা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
একইভাবে, জীবাশ্ম জ্বালানি খাতকে উপেক্ষা করে সবুজ অর্থনীতির বিকাশ ঘটানোর চেষ্টাও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। বিদ্যমান জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বৈশ্বিক স্বার্থের প্রশ্ন; এটি কোনো একক প্রযুক্তি বা আদর্শের একচ্ছত্র বিষয় নয়।

রূপান্তরের গতি নয়, স্থায়িত্বও বিবেচ্য
নবায়নযোগ্য শক্তির অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় এর ভূমিকা আরও বাড়বে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিকাশকে জীবাশ্ম জ্বালানির অবসানের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ভুল হবে। জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবে আরও দীর্ঘ, জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রক্রিয়া।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট সেই বাস্তবতা নতুন করে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে রাষ্ট্রগুলোকে তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। তখন দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত লক্ষ্য এবং স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তার চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়ে।
তাই নবায়নযোগ্য শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা কতটা বাড়ল, তার ওপর নয়; বরং বিদ্যমান জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে এটি কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারল, তার ওপরও। প্রযুক্তির অগ্রগতি, রাষ্ট্রের নীতি, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
জ্বালানি রূপান্তরের সাফল্য কোনো একটি ব্যবস্থার অন্যটিকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলা, যা পরিবেশগতভাবে টেকসই, অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর এবং ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও যতটা সম্ভব নির্ভরযোগ্য থাকে। সেই লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে বিদ্যমান নির্ভরতার বাস্তবতাও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।












