রংপুরে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। নতুন শিল্পকারখানা গড়তে জমির অভাবে উদ্যোক্তারা যেমন বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করতে পারছেন না, তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও। কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত অনেক মানুষকে জীবিকার সন্ধানে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে পাড়ি দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) রংপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন শিল্পনগরী স্থাপনের জন্য একাধিকবার জমির প্রস্তাব পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। ফলে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শহরে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
একটি শিল্পনগরীতে সীমিত সুযোগ
রংপুরে বিসিকের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। সে সময় নগরীর সিও বাজার এলাকায় ২০ দশমিক ৬৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে ৮৩টি শিল্প প্লটে ভাগ করা হয়।
বর্তমানে ওই শিল্পনগরীতে ২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি চালু আছে বলে বিসিকের রংপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আরএফএল), জিএফএল, খান ফাউন্ড্রি লিমিটেড, চৌধুরী আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ, বিসমিল্লাহ মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, নাইন জুট মিলস, হিমাদ্রি কোল্ড স্টোরেজ, রংপুর ফ্লাওয়ার মিলস, নর্দার্ন টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজ, ফিনিক্স কেমিক্যাল অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ এবং মিল্ক ভিটা।
শিল্পনগরীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্লট আরএফএলের দখলে রয়েছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য জমি পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।
এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে ঋণ, বিদ্যুৎ এবং সড়ক যোগাযোগের সুযোগ পায়। এসব সুবিধা শিল্প পরিচালনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখলেও নতুন উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বিদ্যমান শিল্পনগরী যথেষ্ট হচ্ছে না। বিশেষ করে ২০১০ সালে রংপুর বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর নতুন শিল্প স্থাপনের আগ্রহ বেড়েছে।
দুই দফা জমির প্রস্তাব, তবু সিদ্ধান্ত নেই
রংপুরে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০২ সালে। ওই সময় রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে দামদামা এলাকায় ৫০ একর জমি চিহ্নিত করে অধিগ্রহণের অনুমতি চেয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। তবে প্রস্তাবটি আর এগোয়নি।
পরে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর ও রামনাথপুর মৌজায় সম্ভাব্য ১০০ একর জমি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠান। এতে জমির সম্ভাব্য মূল্য ও নকশাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সেই প্রস্তাবের বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা
স্থানীয় উদ্যোক্তা আবদুর রহিমের মতে, দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন করা হলে নতুন কারখানা গড়ার জন্য জমি, ঋণ, বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগের সুবিধা পাওয়া সহজ হবে। শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সরকারি দপ্তর থেকে লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়াও তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তিনি প্রস্তাবিত শিল্পনগরীতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করারও দাবি জানান।
আরেক উদ্যোক্তা হারুন-অর-রশিদ রংপুরে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরীর পাশাপাশি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলে শিল্প কার্যক্রম বাড়ানো, বেকারত্ব কমানো এবং দারিদ্র্য থেকে মানুষের উত্তরণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদ হোসেন বলেন, নির্ধারিত শিল্পজমির সংকটে উদ্যোক্তারা বিভিন্ন স্থানে, এমনকি কৃষিজমিতেও কারখানা স্থাপন করছেন। এতে আবাদি জমি কমে যাওয়া এবং খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
রংপুর বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এহসানুল হক জানান, নতুন শিল্পনগরীর জন্য জমির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উদ্যোগটি বাস্তবায়নে তৎপরতা বেড়েছে এবং মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
তবে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে রংপুরে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে প্রস্তাবিত শিল্পনগরীর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।












