ইয়েমেনের অন্যতম বড় শহর তাইজকে ঘিরে ফেলেছে ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠী। শহরটির সঙ্গে দক্ষিণ ইয়েমেনের সংযোগকারী শেষ সড়কটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অবরোধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। হাসপাতালগুলোতেও জেনারেটর চালানোর জ্বালানি এবং জরুরি ওষুধের মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের চলমান সংঘাতের মধ্যে তাইজের চারপাশে লড়াই তীব্র হয়েছে। শহরের উপকণ্ঠে সরকারি বাহিনী ও হুতি যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে বাসিন্দারা
তাইজের বাসিন্দা আলহান আল-শাইবানির সাত সদস্যের পরিবারও সংকটের মুখে পড়েছে। তিনি জানান, তাঁদের পরিবারকে লবণাক্ত কলের পানি ফুটিয়ে পান করতে হচ্ছে। তাঁর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মা ও দাদি শহরের ওষুধের দোকানগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না।
শহরের বাজারে সবজিও প্রায় পাওয়া যাচ্ছে না। রান্নার গ্যাসের সংকট এতটাই তীব্র যে অনেক পরিবার খাবার গরম করতে কাঠ, কয়লা কিংবা কার্ডবোর্ড পুড়িয়ে চুলা জ্বালাচ্ছে। রান্নার গ্যাস সংগ্রহ করতে পাম্প ও বিক্রয়কেন্দ্রের বাইরে মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার পরামর্শক শায়েফ আল-জাবরি জানান, অক্টোবরের শুরুতে হুতিরা দক্ষিণ ইয়েমেনের সঙ্গে সংযোগকারী সর্বশেষ সড়কটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সংকট দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রথমে দইয়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে উধাও হতে শুরু করে। পরে মানুষ পেট্রল ও রান্নার গ্যাস মজুত করতে থাকে। এখন রাস্তায় আবর্জনা জমছে, আর লড়াইয়ের কারণে বিশুদ্ধ পানি বহনকারী অনেক ট্রাক আটকে আছে।
হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা
তাইজের স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক উপগভর্নর ইলান আবদুল হক সতর্ক করে বলেছেন, শহরের হাসপাতালগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
শহরের প্রধান হাসপাতাল আল-থাওরার মাননিয়ন্ত্রণ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আল-ফাকিহ জানান, হাসপাতালের জেনারেটর চালানোর জ্বালানি প্রায় শেষ। জীবন রক্ষাকারী রোগের ওষুধের মজুতও দ্রুত কমছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, অবরোধ প্রত্যাহার না হলে শহরে বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে নিয়মিত চিকিৎসা ও ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল রোগীদের জন্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া গুরুতর সংকট তৈরি করেছে।
অবরোধ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
হুতিরা শহরের পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে যুক্ত বাহিনীকে দায়ী করেছে। তাদের দাবি, সরকারি বাহিনীই শহরে প্রবেশের সড়ক বন্ধ রেখেছে। একই সঙ্গে হুতিরা প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার প্রাদেশিক গভর্নর আহমদ আমিন বলেছেন, বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ কমাতে নিরাপদ সড়ক খুলে দিতে এবং খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে তারা প্রস্তুত। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক মঙ্গলবার হুতিদের প্রতি তাইজে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, তাইজ ও দক্ষিণ ইয়েমেনের মধ্যকার একটি পথ বন্ধ করে দেওয়ায় বেসামরিক মানুষ গুরুতর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
সংঘাতের বিস্তার, বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর হুতিরা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তাইজ অবরোধ শুরু করে। ২০২২ সালের একটি যুদ্ধবিরতিতে সাময়িক স্বস্তি এলেও চলতি বছর আবার সংঘাত বেড়েছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গত মাসে হুতিরা তাইজকে ঘিরে ফেলার দিকে এগোয়। সৌদি যুদ্ধবিমানের সহায়তায় সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালালেও তাতে সীমিত অগ্রগতি হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে তাইজের অবরোধ নতুন করে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। শহর থেকে পালানোর চেষ্টা করছেন কিছু পরিবার, কিন্তু বের হওয়ার পথগুলোও বিপজ্জনক।
সরকারি বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহরের উপকণ্ঠে হুতিদের ভারী গোলাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ সরবরাহ বন্ধ থাকায় তাঁদের অবস্থানও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে তাইজে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।












