বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার হিসাব বদলে যাচ্ছে। সামরিক শক্তি, পারমাণবিক অস্ত্র কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্য—কোনোটিই এখন আর কোনো রাষ্ট্রকে নিজের ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। একসময় যে দেশগুলোকে পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি কেবল ক্ষমতার ভারসাম্যে রদবদল, নাকি পরাশক্তি ধারণাটিই তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে?
গত জানুয়ারিতে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই পরিবর্তনকে একটি বড় ধরনের বিচ্ছেদ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে হলে মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুঝতে পেরেছিলেন, কার্নির বক্তব্যের একটি অংশ তাঁর প্রশাসনের নীতির প্রতিই ইঙ্গিত করছে।
কার্নির বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু মধ্যম শক্তির দেশগুলোর ঐক্যের আহ্বানে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে আসে: বর্তমান বিশ্বে পরাশক্তি, বৃহৎ শক্তি ও মধ্যম শক্তির মধ্যে পার্থক্য আসলে কতটা অর্থবহ?
যে ক্ষমতা একসময় অপ্রতিরোধ্য ছিল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরাশক্তি বলতে মূলত এমন রাষ্ট্রকে বোঝানো হতো, যার সামরিক সামর্থ্য ও বৈশ্বিক প্রভাব অন্য দেশগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এই ব্যবস্থার প্রধান দুই কেন্দ্র। অল্প সময়ের জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকেও এই শ্রেণিতে বিবেচনা করা হয়েছিল।

বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল মজুত এবং পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে সেগুলো ব্যবহারের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে অন্য সব রাষ্ট্রের তুলনায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। দুই দেশের কাছেই ছিল বিপুলসংখ্যক পারমাণবিক ওয়ারহেড। এমনকি এক দেশ অন্য দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো আঘাত হানতে পারত মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের পাল্টা আঘাত ঠেকানোর নিশ্চয়তা কারও ছিল না।
পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমপর্যায়ের অস্ত্রভান্ডার গড়ে তোলার সক্ষমতা কিংবা সেই পথে এগোনোর রাজনৈতিক ইচ্ছা কোনো দেশই দেখায়নি। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দুই পরাশক্তির বিশেষ অবস্থান দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ন ছিল।
কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র কিছু সময়ের জন্য একক বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থানে উঠে আসে। ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুবার্ট ভেদ্রিন তখন দেশটিকে শুধু পরাশক্তি নয়, বরং ‘হাইপারপাওয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন—যার ক্ষমতার সমকক্ষ আর কেউ ছিল না।
সেই একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থাও স্থায়ী হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সীমা এবং অন্যান্য বড় শক্তির দুর্বলতাগুলো সামনে আসতে শুরু করেছে।
সামরিক শক্তি থাকলেই কি জয় নিশ্চিত?
রাশিয়া এখনো বিপুল সামরিক সম্পদ এবং বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের অধিকারী। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাও অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু অস্ত্রের পরিমাণ ও বাস্তব রাজনৈতিক ফল অর্জনের ক্ষমতা যে এক বিষয় নয়, তা দুই দেশের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে।
ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়ার সামরিক সম্পদ অনেক বেশি। তারপরও দীর্ঘ যুদ্ধের পরও মস্কো প্রতিবেশী দেশটিকে নিজের ইচ্ছামতো বশে আনতে পারেনি। বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও একটি অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রের প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া সহজ হয়নি।
একইভাবে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক শক্তি নিয়ে ধারাবাহিক আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের বিপরীতে যুদ্ধের ফল হিসেবে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অস্থিতিশীল অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জন যে শুধু সামরিক আধিপত্যের ওপর নির্ভর করে না, এই অভিজ্ঞতাও তার প্রমাণ।
এই দুই পরিস্থিতির তাৎপর্য কেবল সংশ্লিষ্ট যুদ্ধগুলোর ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো দেখায়, একটি রাষ্ট্রের কাছে বিপুল অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক অবকাঠামো থাকলেও অন্য রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। সামরিক অভিযান শুরু করা এবং সেই অভিযানকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করা এক নয়।
এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে এখনো পরাশক্তি বলা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এমনকি প্রচলিত অর্থে তাদের বৃহৎ শক্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করাও নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
মধ্যম শক্তির জন্য যে শিক্ষা
মধ্যম শক্তির দেশগুলো সাধারণত নিজেদের সামরিক সামর্থ্যের সীমা সম্পর্কে সচেতন। ভারত, ব্রাজিল কিংবা কানাডা—কোনো দেশই কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক পরিবেশকে নিজের পছন্দমতো সাজাতে পারে না। তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কূটনীতি, রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়।

কিন্তু এই বাস্তবতা এখন আর শুধু মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী পক্ষগুলোকেও নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে অন্যদের সহযোগিতা ও সম্মতি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। তাদের সম্পদ ও প্রভাব বেশি হতে পারে, কিন্তু সেই বাড়তি সামর্থ্য সব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করে না।
এখানেই মধ্যম শক্তির ধারণাটি নতুন তাৎপর্য পায়। কোনো রাষ্ট্রকে শুধু তার অর্থনীতি, সেনাবাহিনী কিংবা আন্তর্জাতিক মর্যাদার ভিত্তিতে বিচার না করে এটিও দেখতে হবে, অন্য রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তনে তার হাতে কী ধরনের কার্যকর উপায় রয়েছে।
কঠোর শক্তির বাইরে প্রভাবের রাজনীতি
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক জোসেফ নাইয়ের ‘সফট পাওয়ার’ ধারণা এই পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সামরিক সক্ষমতা কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যকে বাধ্য করার ক্ষমতা হলো কঠোর শক্তির অংশ। বিপরীতে সফট পাওয়ার গড়ে ওঠে আকর্ষণ, আস্থা এবং স্বেচ্ছায় সহযোগিতা আদায়ের সক্ষমতা থেকে।
সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক বিস্তার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কার্যকর কূটনীতি, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া সদিচ্ছা একটি রাষ্ট্রের প্রভাব বাড়াতে পারে। এই প্রভাব সব সময় দ্রুত ফল দেয় না। বরং এর ভিত্তি তৈরি করতে হয় ধারাবাহিক আচরণ, নির্ভরযোগ্য অংশীদারত্ব এবং অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে।
মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য এ ধরনের সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পক্ষে প্রতিটি বিরোধে সামরিক প্রতিযোগিতায় নামা সম্ভব নয়। বরং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। এতে তাদের প্রভাব শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল থাকে না।
তবে সফট পাওয়ারের গুরুত্ব বাড়ছে বলে কঠোর শক্তির প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। সামরিক সক্ষমতা এখনো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরিবর্তনটি হলো, সামরিক শক্তি একাই আর রাজনৈতিক সাফল্যের পর্যাপ্ত শর্ত নয়।

পুরোনো মর্যাদার মোহ কাটবে কবে?
বড় শক্তির দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন মেনে নেওয়া সহজ নয়। দীর্ঘদিন ধরে যারা নিজেদের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখে এসেছে, তাদের কাছে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা রাজনৈতিকভাবেও কঠিন হতে পারে। অতীতের সামরিক সাফল্য, বিশাল অস্ত্রভান্ডার কিংবা বৈশ্বিক প্রভাবের স্মৃতি তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করলেই অন্যরা শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করছে। রাষ্ট্রগুলো এখন আরও জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে যুক্ত। যুদ্ধের ব্যয় শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিতে সীমিত থাকে না; তা জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। একটি রাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও এসব পরিণতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
ফলে পরাশক্তির মর্যাদা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবে অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। ওয়াশিংটন বা মস্কো নিজেদের যে অবস্থানেই কল্পনা করুক, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিশ্বে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি। বড় রাষ্ট্রগুলোর প্রভাবও বিলুপ্ত হয়নি। কিন্তু ক্ষমতার সংজ্ঞা বদলেছে। এখন প্রশ্ন শুধু কে কত শক্তিশালী, তা নয়; বরং কে নিজের শক্তিকে বাস্তব রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করতে পারে, কে অন্যদের সহযোগিতা অর্জন করতে পারে এবং কে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে কৌশল নির্ধারণ করতে পারে।
এই অর্থে পরাশক্তির যুগের অবসান বলতে যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার দুর্বল হয়ে পড়াকে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর গভীরতর তাৎপর্য হলো, কোনো রাষ্ট্রের ক্ষমতাই এখন আর সীমাহীন নয়। যে দেশগুলো এই সত্য বুঝে কূটনীতি, সহযোগিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেবে, পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তত বেশি থাকবে।
কার্ল বিল্ট, সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী।












