মানুষ নিজের পরিচয় নির্মাণ করে—এমন ধারণা আমাদের মধ্যে প্রবল। সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত মেধা, পরিশ্রম, সংকল্প আর অধ্যবসায়ের কথা সামনে আনি। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত কেমন হয়ে উঠবেন, তা নির্ধারণে তাঁর নিজের চেষ্টার পাশাপাশি অন্য মানুষের ভূমিকাও অসামান্য। কেউ শেখান সত্য কথা বলার সাহস, কেউ চিন্তার জগৎ প্রসারিত করেন, কেউ ব্যক্তিত্বের সূক্ষ্ম দিকগুলো গড়ে দেন, আবার কেউ নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে বিশ্বাস জন্মান। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পেছনে তাকালে তাঁদের প্রভাবের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়।
সম্প্রতি হায়দরাবাদে মান্থন সংবাদে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমার ব্যক্তিত্ব গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছেন কারা। তাৎক্ষণিকভাবে এর পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিতে পারিনি। পরে ভেবে দেখেছি, আমার জীবন ও পেশাগত পরিচয়ের পেছনে চারজন মানুষের অবদান বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তাঁরা প্রত্যেকে ভিন্নভাবে আমাকে গড়ে তুলেছেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; একজন মানুষ কীভাবে অন্যের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারেন, তারও দৃষ্টান্ত।
নিজের মতো হওয়ার সাহস
ডুন স্কুলে আমার হাউসমাস্টার ছিলেন গুরুদিয়াল সিং, যাঁকে সবাই ‘গুরু’ বলে ডাকত। ভূগোল পড়ানো কিংবা সাঁতারের তত্ত্বাবধানের বাইরেও তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল—জয়পুর হাউসের শিক্ষার্থীদের দেখভাল করা। আমার জীবনে তাঁর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে এই ভূমিকাতেই।
গুরু আমাকে শিখিয়েছিলেন, অন্যদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য নিজের মতামত গোপন করা উচিত নয়। সত্য কথা বলতে গিয়ে কেউ অসন্তুষ্ট হতে পারেন, তবু তোষামোদ করে সবাইকে খুশি রাখার চেয়ে নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানো শ্রেয়। এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এমন একটি পরিবেশে, যেখানে খেলাধুলায় সাফল্যকে অনেক সময় অন্য সব প্রতিভার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। আমি বিতর্ক ও অভিনয়ে আগ্রহী ছিলাম। গুরু বুঝিয়েছিলেন, নিজের শক্তির জায়গা চিনে নেওয়া এবং সেখানে উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করাই আসল কথা।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া আরেকটি শিক্ষা ছিল ভুলের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষ ভুল করবে, কখনো গুরুতর ভুলও করবে। কিন্তু একটি ভুলের কারণে কাউকে চিরকাল বিচার করে যাওয়া উচিত নয়। আমার নিজের অনেক ভুল তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমিও এই উদারতা দেখানোর চেষ্টা করেছি, যদিও তাঁর মতো সফল হতে পারিনি।
কৌতূহলই চিন্তার জগৎ খুলে দেয়
স্টো স্কুলে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতেন ব্রায়ান স্টিফান, যাঁকে আমরা বার্টি বলে ডাকতাম। কৈশোরে তাঁকে আমি প্রায় আদর্শ ব্যক্তিত্বের মতো দেখতাম। বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়া মানুষটি অনেকের কাছে হয়তো কঠোর বা খিটখিটে বলে মনে হতেন, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী আকর্ষণের অধিকারী।
বার্টি আমাকে কেবল সাহিত্য শেখাননি; শিখিয়েছিলেন জানতে চাওয়ার প্রবণতা, প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তর খুঁজতে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা। কোনো বিষয়ে মতামত দেওয়ার আগে সবকিছু নিখুঁতভাবে জেনে নিতে হবে—এমন সংকোচেরও তিনি বিরোধী ছিলেন। ভুল হওয়ার আশঙ্কায় চুপ করে থাকার চেয়ে একটি মত প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে তা সংশোধন করা বেশি ফলপ্রসূ।
কৈশোরে তাঁর স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে কাজ করত। তিনি প্রায়ই এমনভাবে উৎসাহ দিতেন, যাতে মনে হতো আমি তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছি। একজন শিক্ষকের এই স্বীকৃতি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস গঠনে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি।
ব্যক্তিত্বের প্রকাশেও থাকে শিক্ষা
কেমব্রিজে গিয়ে আমি এমন এক পরিবেশের মুখোমুখি হয়েছিলাম, যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে বেশি। নিয়মিত বক্তৃতায় উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিল না, শৃঙ্খলাও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হতো না। এই স্বাধীন পরিবেশে আমার শিক্ষক মাইকেল কুচিনস্কি ধীরে ধীরে শিক্ষকতার গণ্ডি পেরিয়ে বন্ধু ও নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠেন।
তাঁর ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল অদ্ভুত, যা অন্যদের কাছে হয়তো কৃত্রিম মনে হতো। কিন্তু আমি তাঁর মধ্যে দেখেছিলাম, নিজেকে জাহির না করেও কীভাবে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। কথা বলার ভঙ্গি, হাসির ব্যবহার, শব্দ বেছে নেওয়া কিংবা হাতের সামান্য নড়াচড়া—এসব ছোট বিষয়ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ। মাইকেল এই সূক্ষ্ম শিল্পে দক্ষ ছিলেন। তাঁকে পর্যবেক্ষণ করে আমিও অনেক কিছু শিখেছি।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া আরেকটি শিক্ষা ছিল রসবোধ। রসিকতা মানেই সবাইকে হাসানো নয়; কখনো অপ্রত্যাশিত মন্তব্য, কখনো প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে কথা বলাও মানুষের মনে আনন্দ জাগাতে পারে। ব্যক্তিত্বের এই বৈশিষ্ট্যকে আমি তাঁর কাছ থেকেই চিনতে শিখেছি।
পেশাগত জীবনে একজন পথপ্রদর্শক
আমার সাংবাদিক হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল চার্লস ডগলাস-হোমের। তিনি দ্য টাইমস-এর উপসম্পাদক ছিলেন এবং সাংবাদিকতা সম্পর্কে প্রায় কিছুই না জানা অবস্থায় আমাকে প্রথম চাকরি দিয়েছিলেন। পত্রিকার নাইজেরিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবে তিনি আমাকে লাগোসে পাঠান।
প্রতিদিন রাত ১১টার দিকে তিনি ফোন করে আমার লেখা প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করতেন। কোথায় বাক্য বিন্যাস আরও ভালো হতে পারত, কীভাবে খবর সাজালে তা পাঠকের কাছে স্পষ্ট হবে, কিংবা প্রতিবেদনের কাঠামো কীভাবে তৈরি করা উচিত—এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত নির্দেশনা দিতেন। এমনকি লেখার শেষ অংশ থেকে সম্পাদনা শুরু করলেও যাতে প্রতিবেদনটি সুসংবদ্ধ থাকে, সেই কৌশলও শিখিয়েছিলেন।
তবে তাঁর অবদান কেবল সাংবাদিকতার কৌশল শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি আমার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন এবং সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। নিজের দক্ষতা সম্পর্কে যে আত্মবিশ্বাস আমার তখন ছিল না, তা গড়ে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এই অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, একজন ভালো নেতৃত্বদাতা শুধু সহকর্মীদের কাজের মূল্যায়ন করেন না; তাঁদের মধ্যে থাকা প্রতিভা শনাক্ত করে সেটিকে বিকশিত হওয়ার পরিবেশও তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে আমিও অন্যদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে এই নীতি অনুসরণের চেষ্টা করেছি। সব সময় যে সফল হয়েছি, তা নয়। কিন্তু একজন মানুষের সম্ভাবনার প্রতি আস্থা রাখার গুরুত্ব আমি ভুলিনি।
মানুষ গড়ে ওঠে অন্য মানুষের স্পর্শে
জীবনে যাঁরা আমাদের প্রভাবিত করেন, তাঁরা সবাই একইভাবে শিক্ষা দেন না। কেউ নৈতিক সাহস জোগান, কেউ প্রশ্ন করতে শেখান, কেউ ব্যক্তিত্বের প্রকাশকে শাণিত করেন, আবার কেউ পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও তৈরি করেন। তাঁদের শিক্ষা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করা যায় না। জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতেই বোঝা যায়, কোন পরামর্শ কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছিল।
আমার ক্ষেত্রেও এই উপলব্ধি এসেছে সময়ের সঙ্গে। ডুন, স্টো, কেমব্রিজ এবং সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলোতে যাঁদের কাছ থেকে শিখেছি, তাঁদের প্রত্যেকের অবদান আলাদা। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একটি মিল রয়েছে—তাঁরা আমাকে নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছেন, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত সাফল্যের হিসাব করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই নিজের অর্জনগুলোর দিকে তাকাই। অথচ সেই অর্জনের ভিত তৈরি করে দেওয়া মানুষদের কথা ভুলে যাই। নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে আমার কাছে বিষয়টি আর অস্পষ্ট থাকে না। আজ আমি যে মানুষ, তার পেছনে আমার নিজের সিদ্ধান্ত ও প্রচেষ্টার পাশাপাশি এই চারজনের শিক্ষাও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁদের অবদান স্বীকার করা শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নয়; মানুষ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্য মানুষের ভূমিকা কতটা মৌলিক, তা স্বীকার করাও।













