কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে শেয়ারবাজারে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, চীনে তা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। দেশটির প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির শেয়ারে ব্যাপক দরপতনে মাত্র চার মাসেরও কম সময়ে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি ডলারের বাজারমূল্য হারিয়ে গেছে। এআই খাতে চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ, চীনা প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানিতে বিধিনিষেধের আশঙ্কা এবং অতিরিক্ত মূল্যায়ন—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরেছে।
চীনের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক স্টার৫০ গত জুলাইয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ পড়ে গেছে। একই সময়ে দেশটির বৃহৎ কোম্পানিগুলোর সিএসআই৩০০ সূচক জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। চীনের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর সরকারি প্রচেষ্টার মধ্যেই এই পতন নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বেইজিংভিত্তিক তহবিল ব্যবস্থাপক ডং বাওঝেনের মতে, শেয়ারবাজারের উত্থান একপর্যায়ে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনানির্ভর হয়ে পড়েছিল। এখন সেই বুদ্বুদ ফেটে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
প্রযুক্তির শেয়ারে বড় ধস

চীনের এআই ও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোর পতন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ সাম্প্রতিক উত্থানে এসব কোম্পানির মূল্যায়ন অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে জনপ্রিয় রোবট নির্মাতা ইউনিট্রির শেয়ার আগস্টে বাজারে লেনদেন শুরুর পর থেকে অর্ধেক হয়ে গেছে। তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটির শেয়ার কেনার জন্য খুচরা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বরাদ্দের তুলনায় ৮ হাজার গুণ বেশি ছিল।
চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটির শেয়ারের দাম গত এক মাসে কমেছে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। অন্যদিকে, মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস ও মুর থ্রেডস টেকনোলজির শেয়ার গত জুলাইয়ের উচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। গত বছর বাজারে আসার সময় কোম্পানি দুটির শেয়ারের দাম যথাক্রমে ৭০০ ও ৪০০ শতাংশ বেড়েছিল।
এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা চীনের শেয়ারবাজারে ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, মূল ভূখণ্ডের এ-শেয়ার ও হংকংয়ের এইচ-শেয়ার বাজারের মোট বাজারমূল্যের ৪২ শতাংশ এআই খাতের কোম্পানিগুলোর দখলে। লেনদেনের মোট পরিমাণেও তাদের অংশ ৫৭ শতাংশ। ফলে এই খাতে পতনের প্রভাব থেকে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশের রেহাই পাওয়া কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধেও বাড়ছে চাপ
দরপতনের পেছনে কোনো একক কারণ স্পষ্ট নয়। তবে শেয়ারের অতিরিক্ত দাম, কর পরিশোধের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের ডেটা সেন্টারে চীনা প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ নির্মাতা ঝংজি ইনোলাইট ও ইওপটোলিংক টেকনোলজির শেয়ার জুন ও জুলাইয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারে এসব কোম্পানির পণ্য সরবরাহ বন্ধ করার সম্ভাব্য পদক্ষেপও তাদের শেয়ারের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
চীনের হাইনান প্রদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী চেন ওয়েনশেং জানিয়েছেন, সরকারি সমর্থন রয়েছে বলে ধারণা করেই তিনি প্রযুক্তি খাতের উত্থানের সময় বিনিয়োগ করেছিলেন। ইউনিট্রির মতো প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রসমর্থিত তহবিলের বিনিয়োগও তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু এখন তাঁকে ও তাঁর বন্ধুদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

নতুন তালিকাভুক্তি ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা
শেয়ারদরের পতনের পরও স্টার৫০ সূচকের কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সূচকটির শেয়ারপ্রতি আয়ের বিপরীতে মূল্যায়নের অনুপাত প্রায় ১০০ গুণ। উত্থানের চূড়ায় তা প্রায় ২৫০ গুণে পৌঁছেছিল। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক১০০ সূচকের এই অনুপাত প্রায় ৩০ গুণ।
এই ব্যবধান থেকে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, দরপতন আরও দীর্ঘ হতে পারে। হংকংভিত্তিক লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার হং হাও মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেক প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা থামিয়ে দিতে পারে। এতে প্রযুক্তি খাতে নতুন মূলধন সংগ্রহও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে সব বিনিয়োগকারী চীনের বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন না। এইচএসবিসির গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন মাসে বিক্রির চাপ থাকলেও এশিয়ার তহবিলগুলোর সামগ্রিক বিনিয়োগে চীনের শেয়ারের ওজন তুলনামূলক বেশি রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসও কয়েকটি চীনা এআই কোম্পানিকে তাদের বিনিয়োগ সুপারিশের তালিকায় রেখেছে।
তারপরও অনেক বিনিয়োগকারী আরও কম দামে শেয়ার কেনার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। সাংহাইভিত্তিক তহবিল ব্যবস্থাপক ওয়াং ঝুওর মতে, চীনের চিপ নির্মাতা ও এআই সরবরাহকারীরাও শেষ পর্যন্ত তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। তাঁর ভাষায়, অন্য বুদ্বুদের মতো এআই খাতের অতিরিক্ত উত্থানও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়তে পারে।
চীনের এআই শেয়ারবাজারে এই ধস তাই শুধু শেয়ারের দাম কমার ঘটনা নয়; প্রযুক্তি খাতে অতিরিক্ত প্রত্যাশা, বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এবং নতুন মূলধন সংগ্রহের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।












