চীনের এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মাত্র চার মাসেরও কম সময়ে দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর স্টার৫০ সূচক ৪০ শতাংশ কমে গেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৫৮ লাখ কোটি টাকার সমান। এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিপুল প্রত্যাশা, শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং চীনা প্রযুক্তিপণ্যের ওপর সম্ভাব্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা এখন বাজারকে চাপে ফেলেছে।
চীনের এই পতন শুধু দেশটির প্রযুক্তি খাতের সংকট নয়, বিশ্ববাজারের জন্যও একটি সতর্কসংকেত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন, এআইয়ের প্রসার থেকে বিপুল মুনাফা আসবে। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা ও আয় বাড়বে কি না, সেই প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে। ফলে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীনের বাজারে এই পতন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশটির সরকার শেয়ারবাজারকে অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্রতিশ্রুতির পর গত দুই বছরে দেশটির শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ছিল, অতীতের মতো দ্রুত উত্থান ও পতনের পরিবর্তে ধীরগতির, স্থিতিশীল এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। কিন্তু এআই ও চিপ খাতের সাম্প্রতিক ধস সেই প্রচেষ্টাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
চীনের বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত সিএসআই৩০০ সূচকও জুনে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ, দরপতন কেবল এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব বৃহত্তর শেয়ারবাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে।
বেইজিংভিত্তিক তহবিল ব্যবস্থাপক ডং বাওঝেনের মতে, চীনের শেয়ারবাজারের উত্থান একপর্যায়ে অতিরিক্ত জল্পনানির্ভর হয়ে পড়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতির বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। শেয়ারের দাম যতটা বেড়েছিল, বাস্তব ব্যবসা ও মুনাফার ভিত্তি ততটা শক্তিশালী ছিল কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলছেন।
এআইয়ের উত্থানের পর এবার পতনের ধাক্কা
চীনের প্রযুক্তি শেয়ারের সাম্প্রতিক উত্থান পশ্চিমা দেশ ও এশিয়ার অন্যান্য বাজারের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। বিশেষ করে এআই অবকাঠামো, চিপ উৎপাদন, রোবট এবং ডেটা সেন্টারসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিপণ্যের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।
কিন্তু উচ্চ মূল্যায়নের সঙ্গে বাস্তব আয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। শেয়ারের দাম কমতে শুরু করলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। একই সঙ্গে নতুন করে বিনিয়োগ করার আগ্রহও কমতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারেও সাম্প্রতিক সময়ে পতন দেখা গেছে। রেকর্ড উচ্চতা থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে নাসডাক সূচক প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। তবে চীনের এআই ও চিপ খাতের পতন অনেক বেশি তীব্র। এতে বোঝা যাচ্ছে, চীনের বাজারে অতিরিক্ত মূল্যায়নের সমস্যা তুলনামূলকভাবে গভীর হতে পারে।
দরপতনের পেছনে কোনো একক ঘটনা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, শেয়ারের অতিরিক্ত দাম, কর পরিশোধের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, চীনের মূল ভূখণ্ডের এ-শেয়ার এবং হংকংয়ের এইচ-শেয়ার বাজারে এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য মোট বাজারমূল্যের প্রায় ৪২ শতাংশ। এসব শেয়ারে লেনদেনের পরিমাণও মোট লেনদেনের প্রায় ৫৭ শতাংশ। ফলে এআই খাতের পতন বাজারের একটি সীমিত অংশের সমস্যা হয়ে থাকেনি; এর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে বহু বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওতে।
জনপ্রিয় কোম্পানির শেয়ারও অর্ধেকে নেমেছে
চীনের প্রযুক্তি খাতের পতনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে, যেগুলো একসময় বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল।
রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আগস্টে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনার জন্য খুচরা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বরাদ্দের তুলনায় আট হাজার গুণ বেশি ছিল। কিন্তু লেনদেন শুরুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটির শেয়ারের দামও গত এক মাসে এক-চতুর্থাংশের বেশি কমেছে। অন্যদিকে, মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস এবং মুর থ্রেডস টেকনোলজির শেয়ার গত বছর বাজারে প্রবেশের সময় যথাক্রমে প্রায় ৭০০ শতাংশ ও ৪০০ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু জুলাই থেকে এই দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামও প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।
এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়লেই তার মূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা যখন শেয়ারের দামের বড় অংশ নির্ধারণ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় সামান্য পরিবর্তনও বড় ধরনের দরপতন ঘটাতে পারে।
দক্ষিণ চীনের হাইনান প্রদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী চেন ওয়েনশেং এআই খাতের উত্থানের সময় শেয়ার কিনেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, ইউনিট্রির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারি সমর্থন রয়েছে এবং এই খাত ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রাষ্ট্রসমর্থিত তহবিল থাকায় তাঁর আস্থাও বেড়েছিল। কিন্তু বাজারের পতনে এখন তিনি ও তাঁর পরিচিত অনেক বিনিয়োগকারী লোকসানের মুখে পড়েছেন।
চেনের অভিজ্ঞতা চীনের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন। সরকার যে প্রযুক্তি খাতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরছে, সেই খাতেই বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়ায় অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
এর ফলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি শেয়ার থেকে অর্থ সরিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় চাপে চিপ ও যন্ত্রাংশ নির্মাতারা
এআই প্রযুক্তির প্রসারের জন্য শুধু সফটওয়্যার বা উন্নত চিপ নয়, ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত বিভিন্ন অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ ও যোগাযোগ প্রযুক্তিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের আশঙ্কা তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ নির্মাতা ঝংজি ইনোলাইট ও ইঅপটোলিংক টেকনোলজির শেয়ারের দাম জুন ও জুলাইয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। এর একটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারে এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য সরবরাহ বন্ধ করার উদ্যোগ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত চীনা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চীনের প্রযুক্তি খাতের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এখানে দুটি উদ্বেগ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, এআই অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগের পর সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয়। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের কারণে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্ভাব্য বাজার ধরে রাখতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন।
এই দুই অনিশ্চয়তা একত্র হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন।
শেয়ারের দাম কমলেও মূল্যায়ন এখনো অনেক বেশি
চীনের প্রযুক্তি শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমলেও বাজারের মূল্যায়ন এখনো তুলনামূলকভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। স্টার৫০ সূচকের মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর গত ১২ মাসের মুনাফার প্রায় ১০০ গুণ। একসময় এই অনুপাত প্রায় ২৫০ গুণে পৌঁছেছিল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ১০০ সূচকের মূল্যায়ন প্রায় ৩০ গুণ। অর্থাৎ, চীনের এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ার এখনো তাদের মুনাফার তুলনায় অনেক বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে।
এই ব্যবধান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আরও দরপতনের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। কারণ, শেয়ারের দাম কমার পরও যদি তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয় ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে মূল্যায়ন আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
হংকংভিত্তিক লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হং হাওয়ের মতে, সাম্প্রতিক পতন অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
নতুন করে শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করতে চাইলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। বাজারে যখন অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং আগের বিনিয়োগকারীরা লোকসানে পড়েন, তখন নতুন শেয়ার বিক্রি করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে বিশেষ করে দ্রুত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নের সংকটে পড়তে পারে।
সরকারের স্থিতিশীল বাজার গড়ার উদ্যোগ কতটা কার্যকর?
চীনের কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা করছে। অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনা এবং উচ্চগতির লেনদেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে বাজারকে আরও স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রসমর্থিত বিনিয়োগকারীরাও বাজারে দ্রুত উত্থান ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে শেয়ার বিক্রি করেছেন।
কিন্তু এআই খাতকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের বিপুল আগ্রহ সেই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় বাজারের অর্থ একাধিক খাতে ভারসাম্যপূর্ণভাবে প্রবাহিত হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
বেইজিংভিত্তিক কিয়ানচুয়াং ক্যাপিটালের অংশীদার লিও ওয়াংয়ের মতে, প্রধান শেয়ারসূচকে প্রযুক্তি কোম্পানির বাজারমূল্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলে বিনিয়োগের অর্থের প্রবাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এর কারণে কিছু প্রযুক্তি খাতে বড় বুদ্বুদ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অন্যান্য খাত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
চীনের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশনের প্রধান উ ছিং চলতি মাসের শুরুতে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব শোনা হয়। তবে সাম্প্রতিক দরপতন নিয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতি চীনের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে: কীভাবে প্রযুক্তি খাতে উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, অথচ অতিরিক্ত জল্পনা এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়?
পতনের মধ্যেও বিনিয়োগের সুযোগ দেখছেন কেউ কেউ
সব বিনিয়োগকারী অবশ্য চীনের এআই শেয়ারের পতনকে দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত মূল্যায়ন কমে যাওয়া বাজারের জন্য ইতিবাচকও হতে পারে। এতে দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো শেয়ারের দাম কমে আসবে এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলনামূলকভাবে আলাদা করে চেনা সহজ হবে।
এইচএসবিসির গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন মাসে চীনের শেয়ার বিক্রি করলেও এশিয়ার বিনিয়োগ তহবিলগুলোর একটি অংশ এখনো দেশটির বাজারে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ ধরে রেখেছে।
গোল্ডম্যান স্যাকস চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত নতুন সুপারিশ তালিকায় ইনোলাইট ও সিএক্সএমটিসহ বেশ কয়েকটি চীনা এআই-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে রেখেছে। বিএনপি পারিবাস সিকিউরিটিজের কৌশলবিদ উইলিয়াম ব্র্যাটনও মনে করেন, সতর্কতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে পারলে বর্তমান বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকতে পারে।
তবে চীনের মূল ভূখণ্ডের অনেক বিনিয়োগকারী এখনই শেয়ার কেনার ব্যাপারে আগ্রহী নন। তাঁরা আরও কম মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। কারণ, শেয়ারের দাম কমলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ মুনাফা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সামনে কি আরও মূল্যযুদ্ধ?
চীনের প্রযুক্তি খাতের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে মূল্য প্রতিযোগিতা। দেশটির উৎপাদন খাতের বিভিন্ন অংশে প্রতিযোগিতা বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার ধরে রাখতে পণ্যের দাম কমাতে বাধ্য হতে পারে। এতে বিক্রি বাড়লেও মুনাফার ওপর চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সাংহাইভিত্তিক ঝুওঝুও ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের অংশীদার ও তহবিল ব্যবস্থাপক ওয়াং ঝুওর মতে, চীনের অন্যান্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মতো চিপ নির্মাতা ও এআই সরঞ্জাম সরবরাহকারীরাও শেষ পর্যন্ত মূল্যযুদ্ধের মুখে পড়তে পারে। তাঁর মতে, এই প্রতিযোগিতা থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানই পুরোপুরি রেহাই পাবে না।
এআই প্রযুক্তির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে লাভবান হবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও উৎপাদন ব্যয়, বিক্রয়মূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রতিযোগীদের চাপ তার মুনাফা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
তাই চীনের এআই খাতের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু শেয়ারের দাম কমে যাওয়ার ঘটনা নয়। এটি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ চাহিদার মধ্যে ব্যবধানেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা টেকসই আয় তৈরি করতে পারে, আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ মোকাবিলা করতে পারে এবং প্রতিযোগিতার মধ্যেও মুনাফা ধরে রাখতে পারে তার ওপর। অতিরিক্ত মূল্যায়ন কমে আসা বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে আরও সুস্থ করতে পারে। কিন্তু মূল্যায়ন এখনো বেশি থাকলে এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে দরপতন আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।
চীনের অভিজ্ঞতা বিশ্ববাজারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা: এআইয়ের সম্ভাবনা যত বড়ই হোক, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ একা শেয়ারের উচ্চ মূল্যকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করবে প্রকৃত আয়, মুনাফা এবং ব্যবসার ভিত্তি।












