ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রণীত ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন চ্যালেঞ্জ করে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ২১টি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান। এই তালিকায় রয়েছে দেশটির দুই শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমও। প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, আইনটির কয়েকটি বিধান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
২০২৫ সালে মোদি সরকার ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে আইনটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গুগলের মতো অনলাইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, সাংবাদিকতার জন্য আলাদা সুরক্ষা বা অব্যাহতির ব্যবস্থা না থাকায় আইনটি সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া ৬৯৮ পৃষ্ঠার এক গোপনীয় আবেদনে ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিএনপিএ) বলেছে, আইনটির বিতর্কিত বিধানগুলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। সংগঠনটির আশঙ্কা, এসব বিধান কার্যকর হলে সাংবাদিকতা কেবল ঘটনা নথিবদ্ধ করার কাজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে; অনিয়ম ও দুর্নীতি উন্মোচনের ক্ষমতা কমে যাবে।
গত ৬ অক্টোবর মামলাটি দায়ের করা হয়। ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসে। মঙ্গলবার মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। মোদি সরকারের গোপনীয়তা আইনের বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত আইনি চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এর আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মী এবং কয়েকটি ছোট সংবাদমাধ্যম আইনটির বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল।
সম্মতি নেওয়ার বিধান নিয়ে উদ্বেগ
ডিএনপিএর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে আম্বানির মালিকানাধীন নেটওয়ার্ক১৮, আদানির মালিকানাধীন এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত টাইমস ইন্টারনেট। নেটওয়ার্ক১৮-এর অধীনে সাতটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম রয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর অন্যতম উদ্বেগ হলো, আইনটির অধীনে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা পণ্য বিক্রির ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সেবা চালুর সময় সম্মতি নিতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ম প্রয়োগ করা হলে তা সংবাদ সংগ্রহের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
ডিএনপিএর যুক্তি, কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর আগে সাংবাদিককে যদি সেই ব্যক্তিকে জানাতে হয় এবং তাঁর সম্মতি নিতে হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রমাণ নষ্ট করতে পারেন কিংবা সাক্ষীদের ভয় দেখাতে পারেন। এতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইনটিতে ব্যক্তির সম্মতি প্রত্যাহার এবং তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার আবেদন করার সুযোগও রাখা হয়েছে। ডিএনপিএ বলছে, জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে এই বিধানের অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। কোনো ব্যক্তি সম্মতি প্রত্যাহার করে তথ্য মুছে ফেলার দাবি জানালে সংবাদমাধ্যমকে প্রকাশিত প্রতিবেদন সরিয়ে নিতে কিংবা তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিতে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
সংগঠনটির মতে, এ ধরনের বিধান অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সংবাদ সরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে জনস্বার্থে প্রকাশিত তথ্যের স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
সাংবাদিকদের গোপন সূত্র প্রকাশের আশঙ্কা
আইনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো। তাদের দাবি, নতুন আইনের অধীনে গঠিত কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নিয়ম না মানার অভিযোগে জরিমানা করতে পারবে। পাশাপাশি, ‘সাধারণ জনগণের স্বার্থে’ প্রয়োজন মনে করলে সরকার তথ্যের প্রবেশাধিকার বন্ধ করার ক্ষমতাও পাবে। ডিএনপিএর মতে, এসব ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মামলার সঙ্গে যুক্ত আগস্ট মাসের একটি চিঠিতে ডিএনপিএ সরকারকে জানিয়েছিল, আইনে রাষ্ট্রের জন্য ব্যাপক ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হলেও সংবাদমাধ্যমের জন্য সমপর্যায়ের সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। সংগঠনটির দাবি, সাংবাদিকতার জন্য সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম না থাকায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার নামে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া আইনের আরেকটি বিধান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এই বিধান অনুযায়ী, ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকার প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিতে পারবে। ডিএনপিএর আশঙ্কা, এই ক্ষমতা সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে সাংবাদিকদের তথ্যদাতা ও গোপন সূত্রের পরিচয় জানতে চাওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।
দুর্নীতি, করপোরেট অনিয়ম কিংবা নির্বাচনী কারচুপি সম্পর্কে তথ্য থাকা ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ভয় পেতে পারেন বলেও মনে করছে সংগঠনটি। তথ্য প্রকাশ করলে তাঁদের পরিচয় সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হলে তথ্যদাতা বা হুইসেলব্লোয়াররা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানো থেকে বিরত থাকতে পারেন।
আবেদনে ডিএনপিএ বলেছে, সরকারকে তথ্য চাওয়ার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নির্দেশনা ও সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। সংগঠনটির দাবি, এই বিধান সাংবাদিক বা তথ্যদাতার কাছে থাকা গোপনীয় যোগাযোগের তথ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তাই বিতর্কিত বিধানগুলো বাতিল করার আবেদন জানিয়েছে তারা।
ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা
ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর আরেকটি আপত্তি হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের মতো কিছু অঞ্চলে সাংবাদিকতার বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিধানে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম বা সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের জন্য লিখিত ও সুস্পষ্ট অব্যাহতি না থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএনপিএ।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, আগস্টে সরকারের সঙ্গে এক বৈঠকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে শুধু মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে রাজি নয় সংবাদমাধ্যমগুলো। তাদের মতে, আইনে স্পষ্ট সুরক্ষা না থাকলে ভবিষ্যতে বিধানগুলোর প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।
ডিএনপিএ ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক
মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে যাওয়ার অভিযোগ করে আসছেন বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও সমালোচকেরা। তাঁদের দাবি, দেশটির অনেক মূলধারার সংবাদমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ড যথেষ্ট কঠোরভাবে পর্যালোচনা করছে না।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। ২০১৪ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১৪০তম। তবে ভারত সরকার এই সূচকের মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
সরকারের বক্তব্য, ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রয়েছে এবং দেশটিতে শত শত সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল নিয়ে একটি প্রাণবন্ত সংবাদমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বিদেশি সংস্থার স্বীকৃতির প্রয়োজন ভারতের নেই বলেও সরকারের অবস্থান।
এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনটি এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মামলার শুনানিতে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর আইনটির বিতর্কিত বিধানগুলোর ভবিষ্যৎ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে।












