ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে শুধু একটি ভৌগোলিক প্রান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। চীনের সঙ্গে অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এখন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। অথচ এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে যে সমন্বয় প্রয়োজন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি তাই কেবল সেনা মোতায়েন বা সীমান্ত পাহারা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা।
চীনের সঙ্গে সীমান্ত: অমীমাংসিত বিরোধের মূল্য
অরুণাচল প্রদেশের উচ্চ সুবানসিরি অঞ্চলে ভারত-চীন সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও কয়েকটি সংগঠন সেখানে চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলেছে। উপগ্রহচিত্রে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত চীনা অবকাঠামো নির্মাণের খবর এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চারণভূমি হারানোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

চীন ম্যাকমোহন লাইনকে স্বীকৃতি দেয় না এবং অরুণাচল প্রদেশের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি বজায় রেখেছে। ফলে সীমান্তের সুনির্দিষ্ট নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাবে। ২০১৭ সালের ডোকলাম অচলাবস্থা এবং ২০২০-২১ সালে গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষ দেখিয়েছে, সীমান্তের অনিশ্চয়তা কীভাবে দুই দেশের সামরিক উত্তেজনাকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
এখানে ভারতের প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু ভূখণ্ড রক্ষা নয়; সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার নিশ্চয়তাও। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোগকে উপেক্ষা করে কিংবা কেবল কূটনৈতিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থেকে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য নজরদারি, নিয়মিত সীমান্ত মূল্যায়ন এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা।
শিলিগুড়ি করিডর ও প্রতিবেশী সম্পর্কের পরিবর্তন
ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের প্রধান স্থলপথ শিলিগুড়ি করিডর। সংকীর্ণ এই ভূখণ্ডের কৌশলগত গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, সরবরাহ এবং সামরিক সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস চীনের সঙ্গে আলোচনায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার সম্ভাবনার প্রসঙ্গ তোলার পর করিডরটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। উত্তর বাংলাদেশের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও এই প্রেক্ষাপটে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে এসেছে। তবে এ ধরনের অবকাঠামোগত পদক্ষেপের তাৎপর্য নির্ধারণ করতে হলে অনুমাননির্ভর আশঙ্কার বদলে যাচাইযোগ্য তথ্য ও সামরিক বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি।
ডোকলাম সংকটের সময় ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী ৭৩ দিন মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি ওই সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছিল, সীমান্তের কোনো একটি সংকট কীভাবে বৃহত্তর যোগাযোগ ও নিরাপত্তা প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি এবং ঢাকা-পাকিস্তান-চীন ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তার মোকাবিলা করতে হবে বাস্তবভিত্তিক কূটনীতির মাধ্যমে। প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে পারে; কিন্তু ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নির্ভর করবে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও যোগাযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা ধরে রাখার ওপর।

মিয়ানমারের যুদ্ধ কীভাবে মণিপুরকে অস্থিতিশীল করছে
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংকটের আরেকটি বড় উৎস মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর দেশটিতে জান্তা সরকার, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। রাখাইন, চিন, সাগাইং ও কায়াহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে লড়াইয়ের বিস্তার ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চলাচল, অস্ত্রের প্রবাহ এবং অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারতের মণিপুর ও মিজোরামের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্তের কিছু অংশ দুর্গম এবং বহু জায়গায় নজরদারি সীমিত। এই বাস্তবতা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর চলাচলের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মণিপুরের সংকটকে শুধু রাজ্যের ভেতরের জাতিগত বিরোধ হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। সীমান্তের ওপারে চলমান যুদ্ধ, অস্ত্রের সরবরাহ এবং আন্তসীমান্ত নেটওয়ার্কও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি মিয়ানমারের সংঘাতকে মানবিক সংকটের পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত করেছে।
বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগরে বিকল্প প্রবেশপথের আগ্রহ মিয়ানমারের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি কথিত সহায়তার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। রাশিয়ার অস্ত্র সরবরাহের খবরও দেশটিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থের উপস্থিতি তুলে ধরে। এসব অভিযোগের প্রতিটি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন; তবে সামগ্রিকভাবে স্পষ্ট, মিয়ানমারের সংঘাত আর কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।
মাদক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার যোগসূত্র
মিয়ানমারের সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো মাদক পাচার। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের সংযোগস্থলে অবস্থিত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ মাদক উৎপাদন ও পাচারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই বাণিজ্যের অর্থ সশস্ত্র নেটওয়ার্ককে টিকিয়ে রাখতে পারে, আর সীমান্তের দুর্বলতা তা নিয়ন্ত্রণের কাজকে কঠিন করে তোলে।

মণিপুরের পাহাড়ি এলাকায় পোস্ত চাষ ও মাদক অর্থনীতির সঙ্গে স্থানীয় অর্থদাতা এবং মধ্যস্থতাকারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সমস্যাটিকে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে এককভাবে যুক্ত করলে প্রকৃত নেটওয়ার্ক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনাগুলো আড়ালে থেকে যাবে। মাদক উৎপাদন ও পাচার ঠেকাতে যেমন আইন প্রয়োগ জরুরি, তেমনি বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করাও প্রয়োজন।
অস্ত্র ও মাদক অর্থের প্রবাহ বন্ধ না করে শুধু নিরাপত্তা অভিযান চালালে সহিংসতার অর্থনৈতিক ভিত্তি অক্ষত থেকে যেতে পারে। মণিপুরের স্থিতিশীলতার জন্য তাই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, মাদকবিরোধী অভিযান এবং স্থানীয় জনগণের জন্য টেকসই আয়ের সুযোগ—সবকিছুকে একই কৌশলের অংশ করতে হবে।
একই সঙ্গে ভারতের উচিত মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী শক্তি, বিশেষ করে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা। কেবল সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করলে দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় অংশের সঙ্গে ভারতের সংযোগ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
উন্নয়ন ও সংযোগের কৌশলও হুমকির মুখে
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ভারতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য কালাদান বহুমুখী পরিবহন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিলিগুড়ি করিডরের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্য ও পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারত।
কিন্তু মিয়ানমারের সংঘাত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অগ্রগতিও ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন কেবল অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো নির্মাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; প্রতিবেশী দেশের স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপরও নির্ভর করছে।
ভারতের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, যোগাযোগের বিকল্প পথ তৈরি করা যেমন কৌশলগত প্রয়োজন, তেমনি সেই পথ সচল রাখার জন্য রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা

মণিপুরে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা সহিংসতা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু, ৬৫ হাজারের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুতি, ত্রাণশিবিরে দীর্ঘ অবস্থান এবং সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিভাজন—এসব শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার চিত্র নয়। এগুলো দেখায়, রাজনৈতিক সমাধান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে না পারলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়।
স্বাধীনতার সাত দশকেরও বেশি সময় পরও যদি একটি রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একইভাবে, ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের ছয় দশকেরও বেশি সময় পরও সীমান্তের স্থায়ী সমাধান না হওয়া অরুণাচল প্রদেশের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
চীন বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে আসায় ভারতের জন্য সীমান্ত বিরোধের কূটনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য আরও বেড়েছে। অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর ও মিজোরামের সমস্যাগুলোকে বিচ্ছিন্ন সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো পরস্পরসংযুক্ত নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ।
ভারতের প্রয়োজন এমন এক বাস্তববাদী নীতি, যেখানে সীমান্তের দৃঢ় সুরক্ষার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা, মাদক ও অস্ত্রের অবৈধ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হবে। সামরিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, কিন্তু তা একা স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ভারত কতটা দ্রুত নিরাপত্তা, কূটনীতি ও উন্নয়নকে একটি সমন্বিত কৌশলে রূপ দিতে পারে তার ওপর।












