ওয়াল স্ট্রিটের প্রযুক্তিনির্ভর উত্থান এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সংশয় বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আবারও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি জোরালো করছে। এই দুই প্রবণতা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে এমন এক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হবে, কিন্তু পণ্যমূল্যের চাপ কমবে না। অর্থনীতির ভাষায় এটাই স্থবির প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিপজ্জনক সমন্বয়—স্ট্যাগফ্লেশন।
বাজারে এর প্রাথমিক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে তুলনামূলক নিরাপদ মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন। অথচ জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা দুর্বল হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সামনে কঠিন নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে: অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে সুদের হার কমানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়লে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।
এআই নিয়ে বর্তমান সংশয়কে সাময়িক বাজার-সংশোধন বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগের অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন যখন বাড়ছে, তখন এর প্রভাব শুধু কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদরে সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

এআইয়ের উত্থান গত দুই বছরে মার্কিন শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশাকেও সমর্থন দিয়েছে। এখন বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল মূলধনি ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর বিনিয়োগকারীরা হিসাব করতে শুরু করেছেন, এই ব্যয়ের বিপরীতে ভবিষ্যতে কতটা আয় আসবে। প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ আর সেই সম্ভাবনাকে ঘিরে তৈরি আর্থিক মূল্যায়ন এক বিষয় নয়। বিনিয়োগের ব্যয় যদি প্রত্যাশিত মুনাফার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়, তাহলে এআইয়ের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অক্ষুণ্ন থাকলেও বর্তমান বাজারমূল্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে।
ঋণবাজারেও এআই খাতের অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ঋণনির্ভর সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে সংশয় বাড়লে তার অভিঘাত বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ এআই এখন আর প্রযুক্তি খাতের একটি বিচ্ছিন্ন বিনিয়োগের গল্প নয়; এটি শেয়ারবাজারের মূল্যায়ন এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পরিস্থিতিতে ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বাড়ার যুক্তি রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন এআই খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির গতি কমিয়ে দেবে, তাহলে তাঁরা নিরাপদ সম্পদে আশ্রয় নেবেন। কিন্তু এখানেই জটিলতা: অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা বাড়লেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ কমতে দিচ্ছে না।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছিল। এর পরিণতিতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ১০ বছর মেয়াদি সুদের হার একসময় ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশে পৌঁছায়। গত সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ একই সময়ে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার আবার ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

সাধারণত জ্বালানির বড় ধাক্কা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। তখন বিনিয়োগকারীরা বন্ড কেনেন, যার ফলে বন্ডের দাম বাড়ে এবং সুদের হার কমে। কিন্তু এআইয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা এত দিন এই প্রচলিত সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছিল। এখন প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় বাড়ায় বন্ডবাজারে নিরাপদ আশ্রয়ের চাহিদা আবার জোরালো হচ্ছে।
তবে বন্ডের সুদের হার কমে যাওয়াকে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি শেষ হওয়ার সংকেত হিসেবে দেখা ভুল হবে। বাজারভিত্তিক হিসাবে আগামী এক বছরের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা গত সপ্তাহে বেড়ে ২ দশমিক ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা জুনের পর সর্বোচ্চ। উৎপাদক পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধিও চার বছরের মধ্যে দ্রুততম গতিতে চলছে। উৎপাদক ও ভোক্তা মূল্যস্ফীতির ব্যবধানও চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়। অর্থাৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ছে, যার কিছু অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ হিসেবে পড়তে পারে।
ফেডারেল রিজার্ভের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়ালে ঋণ ব্যয়বহুল হবে, বিনিয়োগ কমতে পারে এবং এআইসহ অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হতে পারে। আবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কঠোর না হলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পণ্য ও সেবার দামে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

ফেডের নীতিনির্ধারকেরা আশা করতে পারেন, জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক থাকবে এবং তা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে স্থায়ীভাবে ছড়িয়ে পড়বে না। কিন্তু সেই অনুমানের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি প্রায় ছয় বছর ধরে ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। গত বছরের সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে তৈরি তুলনামূলক নিম্ন ভিত্তির প্রভাবেও আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান আরও বাড়তে পারে। ইউবিএসের অর্থনীতিবিদদের ধারণা, আগামী বছরের বসন্তের আগে মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি আসার সম্ভাবনা কম।
এআই খাতের বর্তমান অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত বড় সংকটে রূপ নেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির চালক দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কার সঙ্গে জ্বালানিজনিত মূল্যস্ফীতি যুক্ত হলে ফেডের নীতিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রক্ষার জন্য শিথিল নীতি গ্রহণ করা যাবে না, আবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর নীতি নিলে প্রবৃদ্ধির ওপর আরও চাপ পড়তে পারে।
এই দ্বন্দ্বই স্ট্যাগফ্লেশনের আশঙ্কাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারের প্রত্যাশা সংশোধিত হতে পারে, জ্বালানির দামও একসময় কমতে পারে। কিন্তু দুটি ঝুঁকি একই সময়ে সক্রিয় থাকলে শুধু সুদের হার কিংবা আর্থিক বাজারের গতিপ্রকৃতি দেখে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যাবে না। ফেডের জন্য এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে—মূল্যস্ফীতির স্থায়িত্ব ও প্রবৃদ্ধির দুর্বলতার মধ্যে কোন ঝুঁকিকে কতটা গুরুত্ব দিতে হবে, তা নির্ধারণ করা।
জেমি ম্যাকগিভারের আরও লেখা
শেয়ারবাজারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্মাদনার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সুদের হার
এআই উন্মাদনায় ছোট কোম্পানির উত্থান, কিন্তু সামনে কি কঠিন বাস্তবতা?











