ইসরায়েলের রাজনীতিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাব কতটা গভীর, তার বিচার শুধু তিনি কত দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তা দিয়ে করা যাবে না। গত চার দশকে তিনি দেশটির নিরাপত্তা ভাবনার পরিসর, রাজনৈতিক বিতর্কের সীমা এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের পদ্ধতিতে এমন পরিবর্তন এনেছেন, যার প্রভাব তাঁর ক্ষমতা ছাড়ার পরও দীর্ঘদিন থাকবে। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে দেওয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতকে নিরাপত্তানীতির স্বাভাবিক উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তাঁর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী উত্তরাধিকার।
নেতানিয়াহু হয়তো শিগগিরই ক্ষমতা হারাতে পারেন। বিচারব্যবস্থার ওপর তাঁর সরকারের চাপ, দুর্নীতির মামলা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় নিতে অস্বীকৃতি—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু নেতৃত্বের পরিবর্তন আর রাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এক বিষয় নয়। কোনো সরকার বিদায় নিতে পারে, অথচ সেই সরকারের তৈরি রাজনৈতিক বাস্তবতা পরবর্তী সরকারকেও একই পথে চলতে বাধ্য করতে পারে।
ইসরায়েলে এখন ঠিক সেই পরিস্থিতিই দেখা যাচ্ছে। বিরোধী রাজনীতিকেরা নেতানিয়াহুর শাসনপদ্ধতি, যুদ্ধ পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন। কিন্তু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, অধিকৃত ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কিংবা ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নে তাঁদের অবস্থানের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। ফলে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালেও তাঁর নিরাপত্তা দর্শনের মূল কাঠামো অক্ষত থাকার আশঙ্কাই বেশি।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা কীভাবে প্রান্তিক হলো
ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর আগমনের পর শুরু হয়নি। গোল্ডা মেয়ার ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিলেন। মেনাখেম বেগিনের মিসরের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে সম্মতি দেওয়ার পেছনেও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সমঝোতার বাধ্যবাধকতা না থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলনে স্বাধীন ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করেছিলেন ইয়িৎসহাক শামিরও।

তবে নেতানিয়াহুর বিশেষ ভূমিকা ছিল এই পুরোনো আপত্তিকে এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে রূপ দেওয়া, যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাই মূলধারার বিতর্ক থেকে ক্রমে হারিয়ে যায়।
১৯৯৩ সালে বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক রবিনের অসলো চুক্তিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলারের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইনের আপসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এই ধরনের বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ভূখণ্ড ভাগাভাগি বা সমঝোতার বিরোধিতাকে আরও উসকে দেয়। ১৯৯৫ সালে রবিন হত্যার পর অসলো শান্তিপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। নব্বইয়ের দশকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলাও ইসরায়েলি সমাজে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় বাড়ায়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুকে সহায়তা করে।
তবু তাঁর প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ইসরায়েলের রাজনীতিতে বিকল্প পথের কিছু জায়গা ছিল। এহুদ বারাক ও এহুদ ওলমার্ট ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ভূখণ্ড নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা হয়েছিল, যদিও তা সফল হয়নি। এর আগে ২০০০ সালে বারাক দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করেন। ২০০৫ সালে এরিয়েল শ্যারন গাজা থেকে প্রায় নয় হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীকে সরিয়ে নেন এবং সেখান থেকে স্থলবাহিনী প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেন।
এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করেছিল, ইসরায়েলের রাজনীতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া বা রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না আসায় সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়। ২০০৬ সালে হামাস গাজার নির্বাচনে জয়ী হয় এবং ২০০৭ সালে অঞ্চলটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর ২০০৮, ২০১২, ২০১৪ ও ২০২১ সালে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ হয়। গাজা থেকে রকেট হামলা এবং উত্তরে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণকে নেতানিয়াহু অতীতে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিপদের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। এভাবেই সামরিক নিরাপত্তার যুক্তি রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প হয়ে উঠতে থাকে।
পশ্চিম তীরেও বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখে এবং গাজার হামাস ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মধ্যকার বিভাজন গভীর হতে দিয়ে তাঁর সরকার ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রকল্পকে আরও দুর্বল করেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হামাস-শাসিত গাজায় কাতারের অর্থ পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও এই বিভাজন টিকিয়ে রাখার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ।
২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রগতি ঘটানো তাদের অগ্রাধিকার ছিল না। বরং আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির শর্ত ছিল না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধিতা ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির মৃত্যু এবং ভূখণ্ডটির বড় অংশে ইসরায়েলের পুনরায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ আরও সংকুচিত হয়েছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা অসলো চুক্তির পর দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর তাঁদের হামলা এবং গ্রাম ধ্বংসের ঘটনাও বেড়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ক্রমে পিছিয়ে পড়েছে। মানুষের নিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি এবং বেঁচে থাকার সংকটই এখন সামনে। নেতানিয়াহু নির্বাচনে জিতুন বা হারুন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত পথ কোথায়—তার স্পষ্ট উত্তর ইসরায়েলের রাজনীতিতে অনুপস্থিত।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের রাজনীতি
ফিলিস্তিন প্রশ্নে নেতানিয়াহুর অবস্থানের মতো ইরান সম্পর্কেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শক্তিনির্ভর। ১৯৯২ সালেই তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনাকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন।

এই অবস্থান সব সময় ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের সর্বসম্মত মত ছিল না। ২০১২ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান মেইর দাগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এমন পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, সামরিক হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারবে কি না।
২০১৩ সালে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী সমঝোতার পথ তৈরি হলে সামরিক হামলার বিতর্ক কিছুটা পেছনে চলে যায়। ২০১৫ সালে চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নেতানিয়াহু এই চুক্তির বিরোধিতা করেন এবং তা ঠেকানোর চেষ্টা চালান। কিন্তু ইসরায়েলের ভেতরেও অনেক নেতা মনে করতেন, চুক্তিটি অন্তত এক দশক বা তার বেশি সময়ের জন্য ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটিও তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য অবস্থান ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য দুর্বল করতে পারে—এমন উদ্বেগ ছিল। সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্তজসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও চুক্তিটির সম্ভাব্য সুবিধার কথা বলেছিলেন।
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ইরান আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়, আর কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমে সংকুচিত হয়। এই সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বিস্ফোরণ এবং দেশটির শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী হত্যার ঘটনায় ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। নেতানিয়াহুর পরবর্তী সরকারগুলোও ইরানের সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে অনাস্থা বজায় রাখে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হয়। তেহরান ও বৈরুতে হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যার পাশাপাশি ২০২৪ সালের এপ্রিল ও অক্টোবরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সরাসরি সংঘাতের মাত্রা বাড়ায়।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরবর্তী সময়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বৃহত্তর যুদ্ধ ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রতি ব্যাপক সমর্থন দেখা যায়। বিরোধীদলীয় নেতা লাপিদও একে ন্যায়সংগত যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছিলেন।
যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুর সমালোচনা পরে বাড়লেও ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক বিভাজন দেখা যায়নি। বরং ভবিষ্যতে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা চলছে। এমনকি বামঘেঁষা ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ায়ের গোলান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার সমালোচনা করলে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসে।
এই পরিবর্তনটি তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় ইরানকে মোকাবিলায় কূটনীতি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তির মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। এখন বিতর্কের কেন্দ্র অনেক ক্ষেত্রে সরে গেছে—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করা উচিত কি না, তার বদলে কীভাবে সামরিক চাপ আরও বাড়ানো যায়, সেটিই প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
নেতৃত্ব বদলালেও কেন বদলাবে না কৌশল

নেতানিয়াহুর বিরোধীরা তাঁর সরকার পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ সমর্থন করেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে থাকেন।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসা গাদি আইজেনকট ক্ষমতায় এলে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের গতি কমাতে বা বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দমনে উদ্যোগী হতে পারেন। কিন্তু তিনি পশ্চিম তীরের দখলদারত্ব শেষ করা বা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি। ৭ অক্টোবরের হামলার পর তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকেও অবাস্তব বলে অভিহিত করেছেন। বেনেটের মতো অন্য বিরোধী নেতারাও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেন এবং বসতি সম্প্রসারণকে সমর্থন করেন।
গাজার ক্ষেত্রেও নতুন সরকার নীতিগত পরিবর্তন আনবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনা এবং জিম্মিদের মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারত এমন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে তাঁর অনীহা নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে ক্ষোভ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে তিনি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করেছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক উদ্বেগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
আইজেনকটের সরকার হয়তো গাজার জন্য স্থবির হয়ে থাকা ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত গাজার ওপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে তিনিও নন।
আরও গভীর সমস্যা হলো, ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ এখন ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণকে নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত মনে করে। গাজা, পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন কিংবা সিরিয়া—সব ক্ষেত্রেই এই ধারণা কাজ করছে। ফলে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রণ কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে; নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা উচিত কি না, তা নয়।
ইরান প্রশ্নেও বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনের লক্ষণ নেই। ইসরায়েলের সামরিক নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন পরিস্থিতির কথাও বিবেচনায় রাখছে যেখানে দেশটিকে একাই ইরানের বিরুদ্ধে লড়তে হতে পারে। লাপিদের মতো বিরোধী নেতারা বরং ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলেছেন।
এভাবে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা দর্শন তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তার অংশ হয়ে উঠেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষা ও আচরণে ভিন্ন হতে পারেন, কিন্তু নিরাপত্তানীতির মূল অনুমানগুলো অপরিবর্তিত থাকলে বাস্তব পরিবর্তন সীমিতই থাকবে।
পরিবর্তনের জন্য শুধু সরকার বদল যথেষ্ট নয়

নেতানিয়াহুর অবস্থান এতটা প্রভাবশালী হয়ে ওঠার পেছনে বিরোধী নেতৃত্বের দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলে এমন কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা উঠে আসেননি, যিনি জনমতের বিরোধিতা সত্ত্বেও শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক মূল্য ব্যাখ্যা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। রবিনের মতো নেতা, যিনি নিজের রাজনৈতিক শিবিরের প্রচলিত অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন পথের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন, তাঁর অনুপস্থিতি স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নষ্ট করে এমন নীতি, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ কিংবা গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন যথেষ্ট কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেনি। একই সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এতে নেতানিয়াহুর জন্য আপস ছাড়া নিজের নীতি চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়েছে এবং ইসরায়েলের ভেতরে ভিন্নমত পোষণকারীরাও দুর্বল হয়েছেন।
তবে এই কৌশলের আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করছে। সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও ফিলিস্তিন প্রশ্ন উপেক্ষা করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিক মনে করেন, দেশটির সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সম্ভাব্য অংশীদাররা শেষ পর্যন্ত তাকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
এই আত্মবিশ্বাসই পরিবর্তনের পথে বড় বাধা। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ, ধারাবাহিক সামরিক অভিযান এবং প্রতিপক্ষকে শক্তি দিয়ে দমনের নীতি যদি স্থায়ী নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে, তাহলে সংঘাতের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়।
নেতানিয়াহুর উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইসরায়েলে এমন নেতৃত্ব দরকার, যারা নিরাপত্তাকে শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হিসেবে দেখবে না; বরং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ইসরায়েলের নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে নয়, বিপজ্জনক নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর চাপ প্রয়োগকারী অংশীদার হিসেবেও ভূমিকা নিতে হবে।
বর্তমান নির্বাচনী রাজনীতিতে এমন পরিবর্তনের লক্ষণ খুব কম। নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সংকুচিত করা এবং ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতকে স্বাভাবিক করে তোলার যে রাজনৈতিক কাঠামো তিনি গড়ে তুলেছেন, তা অদূর ভবিষ্যতে টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
কিন্তু এই উত্তরাধিকারকে কৌশলগত সাফল্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। যে নিরাপত্তা দর্শন শান্তির রাজনৈতিক পথ বন্ধ করে দেয় এবং যুদ্ধকে নিয়মিত রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করে, তা শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের পাশাপাশি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকির মধ্যে রাখে।












