কোকেনের নেশা, সন্দেহপ্রবণতা ও অর্থনৈতিক চাপ—এই তিনের যোগসূত্র অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সহিংসতাকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। যুক্তরাজ্যে মাদকাসক্তি ও পারিবারিক নির্যাতনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্যাতনের শিকার নারীদের অভিজ্ঞতা এবং পুলিশের মাদক পরীক্ষার তথ্য বলছে, কোকেন ব্যবহারের সঙ্গে সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক সম্পর্ক রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিজে কাউকে নির্যাতনকারী বানিয়ে দেয় না; আগে থেকে থাকা সহিংস আচরণকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পারিবারিক নির্যাতনের সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ওপর পুলিশের যেসব মাদক পরীক্ষা চালানো হয়েছে, তার প্রায় ৬০ শতাংশে কোকেন শনাক্ত হয়েছে। তবে এসব পরীক্ষার কিছু করা হয়েছিল পুলিশের আগে থেকেই মাদক গ্রহণের সন্দেহ থাকায়। ফলে এই পরিসংখ্যান দিয়ে পারিবারিক নির্যাতনের সব ঘটনায় কোকেনের সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
২০২৩ সালের একটি পরীক্ষামূলক গবেষণাতেও একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। ওই গবেষণায় পারিবারিক নির্যাতনের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ৫৯ শতাংশের পরীক্ষায় কোকেন অথবা আফিমজাতীয় মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষণাটি সীমিত পরিসরে পরিচালিত হওয়ায় এর ফলাফলকে পুরো জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতির সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায় না। তবু বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
নেশা, সন্দেহ আর সহিংসতার দুষ্টচক্র
যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের বাসিন্দা শার্লটের অভিজ্ঞতা এই সমস্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে। করোনাকালীন বিধিনিষেধের সময় তাঁর সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে সন্ধ্যার পর দীর্ঘ সময় কাটত। তাঁরা গান শুনতেন, ইউটিউব দেখতেন এবং রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত গল্প করতেন। এসব সময়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল মদ্যপান ও কোকেন গ্রহণ।
শার্লটের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পর্কের শুরুতে তিনি ভালোবাসা ও গভীর আবেগের বন্ধন অনুভব করতেন। তাঁর সঙ্গী তাঁকে বোঝাতেন, তাঁর মতো করে আর কেউ তাঁকে ভালোবাসবে না। শার্লটও সেই আশ্বাসে বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মাদক ও মদ্যপানের প্রভাবে তৈরি হওয়া ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। রাত শেষ হতো ঝগড়া, সন্দেহ এবং শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে।

কোকেন গ্রহণের পর তাঁর সঙ্গী অস্বাভাবিকভাবে সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠতেন। শার্লট বেশি মাদক নিচ্ছেন, অন্য পুরুষদের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করছেন কিংবা তাঁর কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছেন—এমন নানা অভিযোগ করতেন তিনি। শার্লট এসব অভিযোগ অস্বীকার করলে তাঁকে মারধর করা হতো। পরদিন আবার ক্ষমা চাওয়া হতো এবং ভবিষ্যতে সবকিছু বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো।
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নিত না। একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকত।
‘ইনক্রেডিবল হাল্কের মতো হয়ে যেত’
শার্লট জানান, তাঁর সাবেক সঙ্গী শারীরিক গড়নে ছোটখাটো ছিলেন। কিন্তু কোকেন নেওয়ার পর তাঁর আচরণ ও শক্তি প্রয়োগের ধরন এমনভাবে বদলে যেত যে তাঁকে অন্য মানুষ বলে মনে হতো।
তাঁর ভাষায়, কোকেন গ্রহণের পর লোকটি যেন ‘ইনক্রেডিবল হাল্কের’ মতো হয়ে উঠতেন। তাঁর মধ্যে যেন একটি ভয়ংকর সত্তা জেগে উঠত। এরপর তিনি শার্লটকে নির্মমভাবে মারধর করতেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ছিল ভীষণ আতঙ্কের।
কখনো কখনো তাঁর সঙ্গী শার্লটকে শোবার ঘরে আটকে রাখতেন। এক রাতে বাড়ির ভেতরে কেউ আছে বলে সন্দেহ করে তিনি ছুরি নিয়ে ওপরতলায় চলে আসেন। এরপর সারা রাত ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকেন। শার্লটের জন্য পরিস্থিতিটি ছিল ভয়াবহ ও অনিশ্চিত।
শার্লটের মতে, কোকেন তাঁর সঙ্গীর আগে থেকেই থাকা আচরণগত সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলত। তিনি এটিকে আগুনে জ্বালানি ঢেলে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।
মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতেও তাঁর সঙ্গী শার্লটের ওপর নির্ভর করতেন। কখনো তাঁর ফোন ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা সরিয়ে নিতেন। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যখন শার্লটকে অচেতন করে দেওয়ার পর তাঁর অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের কাছে গিয়েও মুক্তি পাননি
শার্লটের স্মৃতিতে, তাঁদের ফ্ল্যাটে পুলিশ প্রায় ১৯ বার এসেছিল। কখনো শার্লট নিজে ফোন করেছিলেন, কখনো প্রতিবেশীরা অভিযোগ জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি তাঁর সঙ্গীর কোকেন ব্যবহারের বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করতেন।
এর একটি কারণ ছিল নিজের মাদক গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়। তিনি নিজেও কোকেন নিয়েছিলেন বলে পুলিশের কাছে সবকিছু খুলে বলতে সংকোচ বোধ করতেন। ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে নির্যাতনের শিকার হয়েও তাঁকে বারবার নির্যাতনকারীর পক্ষ নিতে হচ্ছিল।
পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে শার্লট নিজেও মদ্যপানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তিনি জানান, কষ্ট অনুভব না করার জন্যই পান করতেন। ঘুম থেকে উঠে সারা দিন মদ্যপান করতেন, শুধু অনুভূতিগুলোকে অসাড় করে রাখতে চাইতেন।
অবশেষে ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর, বড়দিনের পরের দিন, তাঁর জীবনে পরিবর্তনের সুযোগ আসে। সাবেক সঙ্গী মাদক সংগ্রহ করতে বাইরে গেলে শার্লট তাঁর বাবাকে ই-মেইল করে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তিনি নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
এরপর থেকে তিনি মদ ও কোকেন থেকে দূরে রয়েছেন। লিডস উইমেনস এইডের সহায়তায় তিনি নিজের জীবন নতুন করে গুছিয়ে নেন। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির পক্ষে নির্যাতনের শিকার নারীদের সহায়তায় কাজ করছেন। পাশাপাশি স্মার্ট ওয়ার্কস নামের আরেকটি দাতব্য সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত আছেন, যারা নারীদের কর্মসংস্থানে সহায়তা করে।
তবে শার্লটের সাবেক সঙ্গীর বিরুদ্ধে দাঁত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ প্রথমে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও পরে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে তিনি আশঙ্কা করছেন, তাঁর সাবেক সঙ্গী ভবিষ্যতে অন্য কাউকেও নির্যাতন করতে পারেন।
মাদক কি সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়?
পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কাজ করা থেরাপিস্ট ক্যাট চ্যাপেলের মতে, কোকেন মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সন্দেহপ্রবণতাও বাড়াতে পারে। আর পারিবারিক নির্যাতনের অনেক ঘটনার পেছনেই থাকে সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা এবং সঙ্গীর প্রতি অবিশ্বাস।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগে থেকেই থাকা এসব প্রবণতাকে কোকেন আরও তীব্র করে তুলতে পারে। ফলে সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা, ঝগড়া ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কোকেনের সমস্যার চিকিৎসা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও কখনো কখনো নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে বাধা দেয়। নির্যাতনকারী যখন বলেন যে তিনি মাদক ছেড়ে দেবেন বা চিকিৎসা নেবেন, তখন ভুক্তভোগী সেই আশ্বাসে নতুন করে আশা খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে নির্যাতনের চক্র আবারও ফিরে আসে।
লিডস উইমেনস এইডের প্রধান নির্বাহী নিক পিসগুড মনে করেন, কোকেনের সঙ্গে পারিবারিক নির্যাতনের সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনো সম্পর্কে আগে থেকেই নির্যাতন চলতে থাকলে কোকেন নির্যাতনকারীর আত্মসংযম কমিয়ে দিতে পারে, সহিংসতার ঘটনা ঘন ঘন ঘটাতে পারে কিংবা তার তীব্রতা বাড়াতে পারে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোকেন গ্রহণ কাউকে নির্যাতন করার অজুহাত হতে পারে না। কেউ আগে থেকে নির্যাতনকারী বা সহিংস না হলে শুধু কোকেন গ্রহণের কারণে তাঁকে এমন হয়ে উঠতেই হবে, এমন সিদ্ধান্তেরও ভিত্তি নেই।
সামাজিক অবস্থান নির্যাতনের ঝুঁকি আড়াল করতে পারে
পিসগুডের মতে, কোকেন ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি—বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক অবস্থানের মানুষও এই মাদক ব্যবহার করেন।
এ কারণে পারিবারিক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে চেনার প্রচলিত ধারণা অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে বাধা দেয়। বাইরে থেকে সফল, প্রতিষ্ঠিত কিংবা সম্মানিত বলে বিবেচিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ঘরের ভেতরে নির্যাতনের অভিযোগ থাকতে পারে।
মাদক ব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ও অনেককে সাহায্য চাইতে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে পেশাজীবী নারীরা মনে করতে পারেন, অবৈধ মাদক ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ পেলে তাঁদের চাকরি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সন্তান থাকলে তাঁদের ভয় আরও বেড়ে যায়—পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার প্রভাব সন্তানদের ওপরও পড়তে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা করেন।
ফলে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা অনেক সময় পুলিশের কাছে পুরো ঘটনা জানান না। এতে নির্যাতনের প্রকৃত মাত্রা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হয়।
উদ্বেগ বাড়ছে, প্রয়োজন আরও গবেষণা
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে এসে শার্লট এখন মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠার পথে থাকা এবং নির্যাতনের শিকার অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁর মতে, মদ্যপান ও কোকেন গ্রহণের পর ঝগড়া থেকে ভয়াবহ সহিংসতায় পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা অনেকের গল্পেই উঠে আসে।
তিনি মনে করেন, সমস্যাটি কমে যাওয়ার বদলে আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে নির্যাতনের সামাজিক কলঙ্ক এবং ভুক্তভোগীর নিজের মাদক ব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার ভয় প্রকৃত পরিস্থিতিকে আড়াল করে রাখতে পারে।
শার্লটের অভিজ্ঞতা এবং পুলিশের পরীক্ষার পরিসংখ্যান যুক্তরাজ্যে কোকেন ও পারিবারিক নির্যাতনের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের কারণ তুলে ধরে। তবে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে কোকেনকে পারিবারিক সহিংসতার একমাত্র কারণ বলা যায় না। নির্যাতনকারীর আচরণ, সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা, মানসিক অবস্থা এবং মাদক ব্যবহারের মতো একাধিক বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপদে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো, মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণা করা জরুরি। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্তি চিকিৎসার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে, কিন্তু নির্যাতনের দায় নির্যাতনকারীরই।












