ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েও শেষ হাসি হাসলেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। দ্বিতীয় দফার ভোটে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন নজির গড়েছেন লুলা। বিজয় ভাষণে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দেশে আর কখনো স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে দেবেন না।
সোমবার ভোরে সাও পাওলো শহরের কেন্দ্রে হাজারো সমর্থকের সামনে বিজয় ভাষণ দেন লুলা। এ সময় উচ্ছ্বসিত জনতা তাঁকে অভিনন্দন জানান। লুলা বলেন, ‘এটি ঈশ্বরের কাজ, আর এর জন্য আপনাদের সবার অবদান রয়েছে।’
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র সব সময় থাকবে, স্বৈরশাসন আর কখনো নয়। গণতন্ত্র সব সময় থাকবে, ফ্যাসিবাদ আর কখনো নয়।’
অক্টোবরের শুরুতে প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়েছিলেন লুলা। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন তিনি। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের পর ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর এমন ঘটনা আগে ঘটেনি। প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় জয়ী হওয়ার নজির গড়লেন লুলা।
ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে লুলা

চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লাখ ভোট। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লাখ ভোট। লুলার ভোটের হার ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ, আর বলসোনারোর ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রথম দফার তুলনায় দ্বিতীয় দফায় লুলার ভোট বেড়েছে অন্তত এক কোটি।
লুলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলেকজান্দ্রে পাদিলহা এই জয়কে ব্রাজিলের জনগণের বড় অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ভোটাররা দেশের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবেশ এবং সংবিধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে ডানপন্থী প্রার্থীর জয় হলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত, সেটিও তাঁরা বিবেচনা করেছেন।
পাদিলহা বলেন, এই জয় শুধু ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, পুরো লাতিন আমেরিকা ও বিশ্বের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
পরাজয় মেনে নিতে নারাজ বলসোনারো
নির্বাচনে হেরে লুলার জয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তাঁর বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোও ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফল মেনে নেননি। পরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার ঘটনায় তাঁর কারাদণ্ড হয়।
ফ্লাভিও লুলার বিজয়কে অবজ্ঞা করে মন্তব্য করেন। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা দ্রুত লুলাকে অভিনন্দন জানান।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম বলেন, ব্রাজিলের জনগণ জয়ী হয়েছে এবং গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মনে করেন, বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল রাজনীতির নতুন উত্থান শুরু হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডও লুলার জয়কে বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্রাজিলের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে যুক্তরাজ্য।
চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত লুলাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। পেরুর প্রেসিডেন্ট কেইকো ফুজিমোরিও ব্রাজিলের জনগণকে শুভেচ্ছা জানান। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, ব্রাজিলে গণতন্ত্র ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতার জয় হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানায়, তারা ব্রাজিলের জনগণের সিদ্ধান্তকে সম্মান করে।
নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ফল প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ফ্লাভিও বলসোনারোর জয় চাইছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কথা জানা যায়নি।
ব্রাজিলের আইনপ্রণেতা এরিকা হিলটন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল ব্রাজিলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
তিনি বলেন, ব্রাজিল ও দেশটির জনগণ এত বড় যে কোনো দেশের প্রভাবাধীন অঞ্চল হয়ে থাকার প্রশ্নই আসে না।
আমাজন বন ও আদিবাসীদের জন্য নতুন আশা
লুলার জয় ব্রাজিলের পরিবেশনীতি এবং আমাজন বন সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অঞ্চল এই আমাজন বন। বন রক্ষা করা এবং সেখানে বসবাসকারী আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করা ব্রাজিলের বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনের আগে দেশটির সাবেক পরিবেশমন্ত্রী মারিনা সিলভা সতর্ক করেছিলেন, ফ্লাভিও বলসোনারো জয়ী হলে তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোর সময়ে শুরু হওয়া বন ধ্বংসের নীতি আরও বাড়তে পারে। জাইর বলসোনারোর ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের শাসনামলে আমাজন অঞ্চলে বন উজাড় নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
লুলার জয়ের পর মারিনা সিলভা আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁর মন আনন্দ ও কৃতজ্ঞতায় ভরে গেছে। বিশেষ করে আদিবাসীদের ভূমির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী।
সিলভার আশঙ্কা ছিল, আদিবাসীদের এলাকায় আবারও অবৈধ খননকারীদের প্রবেশ বাড়তে পারে। লুলা জয়ী হওয়ায় তিনি আশা করছেন, এসব এলাকা সুরক্ষিত থাকবে এবং অবৈধ খননের কারণে আদিবাসীদের জীবন ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

পরাজয়ের পর কঠিন পরিস্থিতিতে ফ্লাভিও
নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হওয়ার পর ফ্লাভিও বলসোনারোর সমর্থকদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। ব্রাসিলিয়ায় যে বাড়িতে বসে তিনি ভোটের ফল দেখছিলেন, সেখানে শুরুতে উৎসবের পরিবেশ থাকলেও পরে তা বিষণ্ন হয়ে ওঠে। একে একে অতিথিরা বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে থাকেন।
সাও পাওলোর পাওলিস্তা অ্যাভিনিউতে লুলার সমর্থকেরা জয় উদ্যাপন করেন। তাঁদের কেউ কেউ ফ্লাভিওকে কারাগারের পেছনে দেখানো পোশাক পরে আনন্দ প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর পরাজয় নিয়ে বিভিন্ন ছবি ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাঁকে কাঁদতে দেখা যাচ্ছে—এমন একটি আলোচিত ছবি নির্বাচনের আগের দিনের বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ফ্লাভিওর বর্তমান মেয়াদ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলে এবং তিনি সংসদীয় দায়মুক্তি হারালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেতে পারেন বলে কিছু মহলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ফেডারেল পুলিশের একাধিক তদন্ত চলছে। তবে এসব অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন তিনি।
লুলার কিছু সমর্থক আশা করছেন, ফ্লাভিওও তাঁর বাবার মতো কারাগারে যেতে পারেন। জাইর বলসোনারো অভ্যুত্থানের চেষ্টার ঘটনায় ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
২৭ বছর বয়সী মনোবিজ্ঞানী জোয়াও মালুফ ফ্লাভিওর একটি ছবি দেখিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘আহা, কী ভয়াবহ! বেচারা ছোট্ট মানুষটি!’
লুলার এই জয় ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন তাঁর সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, পরিবেশ রক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতি এবং রাজনৈতিক বিভাজন কমানো। নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো তিনি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন, তা দেখার অপেক্ষায় থাকবে ব্রাজিলের মানুষ।












