জাপানে এমন কিছু বাড়ি রয়েছে, যেখানে অতীতে কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যা কিংবা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব বাড়িকে ঘিরে মানুষের মনে ভয় ও নানা কুসংস্কার কাজ করে। ফলে সাধারণ বাড়ির তুলনায় এগুলোর দাম অনেক কম হয়। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় জাপানে এখন এসব বাড়ির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। সস্তায় ভালো বাড়ি খুঁজতে গিয়ে অনেকেই অতীতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এমন বাড়ি কিনতে বা ভাড়া নিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
টোকিওর সেটাগায়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন রিউয়া। তাঁর দাবি, এই বাসায় তিনি এক ভূতের সঙ্গে বসবাস করছেন। চার বছর আগে প্রথমবার বাসাটি দেখতে গিয়েই তাঁর মনে হয়েছিল, সেখানে অদ্ভুত কিছু রয়েছে।
রিউয়া বলেন, বাসা দেখতে গিয়ে তিনি এক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। লোকটি তাঁর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু সঙ্গে থাকা আবাসন এজেন্ট ওই ব্যক্তিকে দেখতে পাননি। তখনই রিউয়ার মনে হয়, তিনি হয়তো কোনো ভূত দেখেছেন।
অন্য কেউ এমন অভিজ্ঞতার মুখে পড়লে হয়তো বাসাটি ছেড়ে চলে যেতেন। কিন্তু রিউয়া উল্টো সেখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ভাষায়, তিনি কিছুটা প্রচলিত ধারণার বিপরীতে চলতে পছন্দ করেন। তাই ওই ভূতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছা থেকেই বাসাটিতে ওঠেন।
জাপানে তরুণ বিনোদনশিল্পী হিসেবে কাজ করা রিউয়া নিজের পদবি প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর দাবি, বাসায় ওঠার পর থেকে প্রতিদিনই তিনি নানা অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কখনো অবিরাম পায়ের শব্দ শোনেন, কখনো শুনতে পান ভূতের কথা বলার আওয়াজ।
বাসাটির আগের বাসিন্দা সেখানে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানা যায়। জাপানে এমন মৃত্যুর ঘটনা কোনো বাড়ির সামাজিক পরিচিতি ও বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
মৃত্যুর ইতিহাস, অর্ধেক দামে বাড়ি
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কাগোশিমা এলাকায় বসবাস করেন ৭৯ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক ডায়ান টিনচার। প্রায় ৪০ বছর ধরে জাপানে থাকা এই নারী পেশায় পর্যটক গাইড। তিনি এমন একটি তিন শয়নকক্ষের বাড়ি কিনেছেন, যার আগের এক বয়স্ক বাসিন্দা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন।
টিনচার জানান, বাড়িটি কেনার সময় আবাসন এজেন্ট তাঁকে মৃত্যুর ঘটনাটি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলেন। ওই ঘটনার কারণে বাড়িটি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। ফলে সাধারণ বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দামে সেটি বিক্রি করা হয়।
বাড়িটি কিনতে তাঁর খরচ হয়েছে দুই কোটি ইয়েন। অথচ ওই এলাকার একই ধরনের বাড়ির দাম সর্বোচ্চ চার কোটি ৫০ লাখ ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, কাছাকাছি এলাকার তুলনীয় বাড়ির সর্বোচ্চ দামের তুলনায় তিনি অর্ধেকেরও কম দামে বাড়িটি কিনেছেন।
টিনচার ভূতে বিশ্বাস করেন না। তবে জাপানের অনেক মানুষের মধ্যে এ ধরনের বিশ্বাস রয়েছে, তা তিনি জানেন। তাঁর কথায়, বাড়িতে যদি সত্যিই কোনো ভূত থেকে থাকে, তাহলে তিনি প্রতিদিনই তার প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, এর ফলে তিনি চমৎকার একটি বাড়িতে তুলনামূলক কম খরচে থাকতে পারছেন।
ভূতুড়ে বাড়ির তথ্য মেলে বিশেষ ওয়েবসাইটে
জাপানে অতীতে অস্বাভাবিক মৃত্যু বা দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে—এমন বাড়ির জন্য একটি বিশেষ শব্দ প্রচলিত রয়েছে: ‘জিকো বুক্কেন’। সাধারণত এসব বাড়ির অতীত ইতিহাসের কারণে ক্রেতা বা ভাড়াটেদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়। ফলে বাড়ির মালিকেরা অনেক সময় দাম কমাতে বাধ্য হন।
টিনচার এমন একটি বাড়ির সন্ধান পেয়েছিলেন ওশিমাল্যান্ড নামের একটি ওয়েবসাইটে। এখানে জাপানের বিভিন্ন বাড়িতে ঘটে যাওয়া মৃত্যুসহ নানা ঘটনার তথ্য তালিকাভুক্ত করা হয়।
২০০৫ সালে টোকিওর বাড়িগুলোর তথ্য নিয়ে ওয়েবসাইটটির যাত্রা শুরু হয়। পরে এটি জাপানের অন্যান্য অঞ্চলে সম্প্রসারিত হয় এবং ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিস্তৃত হয়। সাধারণ মানুষও এখানে বিভিন্ন বাড়ির ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যুক্ত করতে পারেন।
ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতা তেরু ওশিমা জানান, অতীতে জাপানে এ ধরনের বাড়ি মানুষের কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে বাড়ির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবার খরচ। ফলে কম দামে বাড়ি পাওয়ার বিষয়টি মানুষের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, জাপানের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ কম ভাড়ায় পাওয়া গেলে জিকো বুক্কেন ধরনের বাড়িতে থাকতে রাজি হতে পারেন।
অর্থাৎ, অতীতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে—এমন বাড়ি নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে। একসময় যে বাড়িকে অনেকে এড়িয়ে চলতেন, সেটিই এখন কারও কারও কাছে সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ হয়ে উঠছে।
ভয় নয়, অতীতকে সম্মান করেন রিউয়া
অন্যদিকে, টোকিওর বাসিন্দা রিউয়ার কাছে ভূতের সঙ্গে থাকার বিষয়টি ভয়ের নয়। বরং তিনি মনে করেন, ভূত বলে যাদের ধারণা করা হয়, তারাও একসময় জীবিত মানুষ ছিলেন। তাই তাঁদের প্রতিও সম্মান দেখানো উচিত।
ভূত থাকার দাবি অবশ্যই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের বিষয়; এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখানে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে জাপানের আবাসনবাজারে এসব বাড়ির উপস্থিতি এবং সেগুলো ঘিরে মানুষের আগ্রহ একটি বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বাড়ির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় যখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে উঠছে, তখন অতীতের নেতিবাচক ইতিহাসও কোনো কোনো বাড়িকে সাশ্রয়ী বিকল্পে পরিণত করছে। ফলে জাপানে ভূতুড়ে বাড়ি নিয়ে ভয় ও কৌতূহলের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নতুন আবাসন-সমীকরণ।












