ভারতের টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স জিও প্ল্যাটফর্মস শেয়ারবাজারে অভিষেকের প্রথম দিনেই ২৭ শতাংশের বেশি দর বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। ৩২০ কোটি ডলারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পর প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। এর মধ্য দিয়ে জিও ভারতের বাজারমূল্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। শীর্ষে রয়েছে এর মূল প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স গোষ্ঠী।
বুধবার মুম্বাইয়ে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে জিওর শেয়ার লেনদেন শুরু হয়। দিনের শেষে শেয়ারটির দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৪১৭ দশমিক ৫০ রুপি, যেখানে আইপিওতে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ১১৯ রুপি। লেনদেনের একপর্যায়ে শেয়ারটির দর সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল।
জিওর বাজারমূল্য টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ভারতী এয়ারটেল ও এইচডিএফসি ব্যাংককেও ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে, রিলায়েন্স গোষ্ঠীর সম্মিলিত বাজারমূল্য বেড়ে প্রায় ৩২ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে তালিকাভুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত বাজারমূল্যের হিসাবে টাটা গোষ্ঠীকে পেছনে ফেলেছে রিলায়েন্স।
তেল-রাসায়নিক থেকে প্রযুক্তি ও ভোক্তাপণ্যে বিস্তার
জিওর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি রিলায়েন্সকে তেল ও রাসায়নিকনির্ভর ব্যবসা থেকে প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও ভোক্তাপণ্যসহ বিস্তৃত খাতের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মুকেশ আম্বানির পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। প্রায় দুই দশক পর রিলায়েন্স গোষ্ঠীর কোনো প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের তালিকাভুক্তি হলো।
জিওর টেলিযোগাযোগ সেবার গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটির বেশি। একক দেশের গ্রাহকসংখ্যার হিসাবে বিশ্বে চীনের চায়না মোবাইলের পরেই রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রযুক্তি খাতে এর অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে মেটা প্ল্যাটফর্মস ও গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট।
আইপিও থেকে পাওয়া নিট অর্থের সর্বোচ্চ ২৮৯ কোটি ডলার টেলিযোগাযোগ ব্যবসার ঋণ পরিশোধে ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে জিও। এ পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠানটির ঋণের চাপ কমানোর উদ্যোগের অংশ।
বড় সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও দেখছেন বিশ্লেষকেরা
জিওর শেয়ারের প্রাথমিক উত্থানকে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ফিডেন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ঐশ্বর্য দাধিচ বলেন, আইপিওর মূল্যায়নে বিনিয়োগের সুযোগ ছিল, কিন্তু তালিকাভুক্তির পরের দাম প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বেশি আশাবাদ প্রকাশ করছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কয়েকটি ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকেরা। এর মধ্যে রয়েছে বাজারে প্রতিযোগিতা, বিপুল মূলধনি ব্যয় এবং ভারতের টেলিযোগাযোগ খাতের নীতিমালায় সম্ভাব্য পরিবর্তন। বিশেষ করে স্পেকট্রাম, লাইসেন্স ও ফি-সংক্রান্ত নিয়ম জিওর ভবিষ্যৎ ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ওয়েলথমিলস সিকিউরিটিজের ইকুইটি কৌশলবিদ ক্রান্তি বাথিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও অস্থির বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও জিওর শেয়ার শক্তিশালী সূচনা করেছে। এখন থেকে শেয়ারটির গতিপথ নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফার ওপর।
আম্বানি পরিবারের উত্তরাধিকার পরিকল্পনায় নতুন অধ্যায়
মুম্বাইয়ে তালিকাভুক্তির অনুষ্ঠানে মুকেশ আম্বানি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। জিওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকাশ আম্বানিসহ পরিবারের তিন সন্তান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। এ সময় মুকেশ আম্বানিকে আবেগাপ্লুত অবস্থায় দেখা যায়।
২০০২ সালে বাবা ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যুর পর মুকেশ ও তাঁর ছোট ভাই অনিল আম্বানির মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে মুকেশ দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাধিকার পরিকল্পনা সাজিয়েছেন।
জিওর তালিকাভুক্তি ভারতের শেয়ারবাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চলতি বছর এ পর্যন্ত ভারতে ২৪৬টি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের সংখ্যার হিসাবে দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় বাজারে পরিণত করেছে। তবে জিওর বিপুল আকারের আইপিও থেকেও এর ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ডলার ফি পাবে—যা মোট প্রস্তাবের প্রায় শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ।
জিওর বাজারমূল্যের এই উত্থান রিলায়েন্স গোষ্ঠীর জন্য বড় সাফল্য হলেও, প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নির্ধারিত হবে প্রতিযোগিতা মোকাবিলা, বিনিয়োগ ব্যয় সামলানো এবং আয়-মুনাফা বাড়ানোর সক্ষমতার ওপর।












