গত কয়েক দিন ধরে রাজধানী ও এর আশপাশে পোশাক শ্রমিকেরা তাঁদের বেতন ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার জন্য আন্দোলন করছেন।
বাংলাদেশের নেতারা, এমনকি ব্যবসায়ীরাও গর্ব করে বলেন, তাঁদের এক নম্বর রপ্তানি পণ্য পোশাক। বিদেশি কোনো রাষ্ট্রনায়ক যখন এ দেশে এসে বলেন, বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, তখন বাংলাদেশের নেতারা ও ব্যবসায়ীরা গর্বে ফেটে পড়েন।
কিন্তু এই পোশাক যাঁরা তৈরি করেন, সেই শ্রমিকদের দুর্ভাগ্য হলো, তাঁরা রাজপথে আন্দোলন না করে তাঁদের বেতন বাড়াতে পারেন না। তবু তাঁরা ন্যায্য মজুরি পান না।
২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আন্দোলন করে তাঁরা শিক্ষানবিশ বা এন্ট্রি-লেভেলের কর্মীদের বেতন ১,৬০০ টাকা থেকে ৩,০০০ টাকা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাও বলা যেতে পারে, একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে হস্তক্ষেপ করে ব্যবসায়ীদের এই বেতনকাঠামো মেনে নিতে বাধ্য করেন। কিন্তু সে সময় তাঁদের দাবি ছিল ৬,০০০ টাকা। পরে আবার আন্দোলনের মুখে ২০২৩ সালে এন্ট্রি-লেভেলে বেতন নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার টাকা।
এখন তাঁরা দাবি করছেন ৩০ হাজার টাকা বেতন। তাঁরা যখন ৩০ হাজার টাকা বেতন দাবি করছেন, সে সময় দেশের একটি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মাসে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন পেলে একটি পরিবারের হাতে মাস শেষে ৭০ টাকা থাকে। তবু তাঁরা প্রয়োজনীয় খাবার খান না।
সেখানে রাতদিন পরিশ্রম করেও যদি ৩০ হাজার টাকা না পান, তাহলে তাঁরা বাঁচবেন কীভাবে? যেখানে এক মুঠো শাক কিনতে ৩০ টাকা লাগে, এক পাতা নাপা ট্যাবলেট কিনতে তাঁদের খরচ করতে হয় ২৮ থেকে ৩০ টাকা, সেখানে পোশাক কারখানায় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকার কিছু বেশি বেতন পেয়ে কীভাবে তাঁরা বাঁচবেন?
তার ওপর, এই সরকার ক্ষমতায় এসে সরকারি কর্মচারীদের বেতন অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বেতন তাঁরা এ মাসে পাবেন। এই বেতন পাওয়ার পর বর্তমানের এই আকাশছোঁয়া বাজারে আরও প্রভাব পড়বে।

মাছ-মাংস বাদ দিন, গরিবের প্রোটিন মসুর ডালের দামও নিম্নমানেরটা কেজিপ্রতি ১২২ টাকা। ভালো ডালের দাম আরও বেশি। সবচেয়ে নিম্নমানের খামারের ডিমও ১২ থেকে ১৩ টাকার কমে একটি পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে ১৫ হাজার টাকায় একটি পরিবার কীভাবে চলবে?
তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এ মুহূর্তে দেশের রপ্তানি সচল রাখার জন্য বেতন বাড়ানো, নাকি সরকারি প্রশাসনের কর্মীদের বেতন বাড়ানো—কোনটি আগে দরকার ছিল? তার ওপর রয়েছে প্রায় এক শ মন্ত্রী ও উপদেষ্টার খরচ।
অন্যদিকে, বোয়িং বিমান কেনা হচ্ছে, আমেরিকা থেকে বেশি দামে গম আমদানি করা হচ্ছে। অথচ এসব কিছু চললেও দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের মূল সম্পদ সেই দরিদ্র পোশাকশ্রমিকদের তীব্র রোদে রাস্তায় নেমে বেতনের জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে—বললে ভুল হবে, তাঁরা আসলে বেঁচে থাকার জন্য আন্দোলন করছেন।
বর্তমানে নিত্যপণ্যের দাম, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম সরকার ভালো করেই জানে। তার ওপর মানুষের বাসায় বিদ্যুতের বিল কত বেড়েছে, সেটা সরকারের চেয়ে বেশি কেউ জানে না। রান্নার গ্যাস ও কেরোসিনের দাম কত বেড়েছে, সেটাও সবার আগে সরকার জানে।
তাই দেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ, যাঁদের কায়িক শ্রমের ওপর অর্থনীতি নির্ভর করছে, তাঁদের ন্যূনতমভাবে বেঁচে থাকার দাবিটি মেনে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করার কি কোনো যুক্তি আছে? রোদে-জলে ভিজে ওই নারীদের বারবার এভাবে রাজপথে নামতে বাধ্য করার কি কোনো যুক্তি আছে?












