মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় হুতিদের নাম সাধারণত আসে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার প্রসঙ্গে। কিন্তু এই সশস্ত্র আন্দোলনের পেছনে থাকা মানুষগুলো কারা? তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয় কী? কীভাবে তাদের একটি অংশ সংগঠিত বিদ্রোহী শক্তিতে পরিণত হলো? যুদ্ধের মধ্যে তাদের পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবন কীভাবে বদলে গেল?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জিনি হিলের Yemen Endures: Civil War, Saudi Adventurism and the Future of Arabia বইটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে প্রকাশিত বইটিতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি সা’দা অঞ্চলের সংঘাত, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতিযোগিতা, গোত্রীয় সম্পর্ক, সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং হুতিদের উত্থানের পটভূমি উঠে এসেছে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বইটি হুতিদের প্রত্যেক সদস্যের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে আলাদা কোনো নৃতাত্ত্বিক গবেষণা নয়। লেখক মূলত ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট, সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পক্ষের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। তাই বইয়ে যে সামাজিক জীবনের ছবি পাওয়া যায়, তার কিছু অংশ হুতিদের নিজস্ব সংগঠন ও সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর কিছু অংশ বৃহত্তর ইয়েমেনি সমাজের জীবনযাত্রা তুলে ধরে। এই দুইয়ের পার্থক্য বজায় রেখেই হুতিদের বোঝা জরুরি।
হুতিদের জন্ম কোথায়, তাদের পরিচয় কী
হুতিদের উত্থানের কেন্দ্র উত্তর ইয়েমেনের সা’দা প্রদেশ। সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানকার বহু মানুষ জায়দি শিয়া ইসলামি ঐতিহ্যের অনুসারী। হুতি আন্দোলনের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে ওঠে এই জায়দি সমাজের মধ্যেই।
জায়দি মতবাদ শিয়া ইসলামের একটি স্বতন্ত্র ধারা। ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুসৃত দ্বাদশী শিয়া মতবাদের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য রয়েছে। দুই ধারার মধ্যে কিছু মিল থাকলেও তাদের এক করে দেখা ঠিক নয়। একইভাবে, সব জায়দি মুসলমান হুতিদের সমর্থক নন, আর হুতিদের সমর্থন করার কারণও সবার ক্ষেত্রে এক নয়।
১৯৬২ সালে উত্তর ইয়েমেনে রাজতন্ত্রের পতনের পর প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পুরোনো ধর্মীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় সমাজ এবং নতুন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের কিছু মানুষের দূরত্ব তৈরি হয়। সা’দার মানুষের মধ্যে এমন ধারণাও ছিল যে, রাজধানীকেন্দ্রিক ক্ষমতা তাদের অঞ্চলকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
জিনি হিলের বইয়ে এই পটভূমি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, হুতিদের উত্থান শুধু ধর্মীয় মতাদর্শের ফল ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল স্থানীয় পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ।
ধর্মীয় শিক্ষা থেকে রাজনৈতিক সংগঠন
হুতিদের ইতিহাসের গোড়ায় রয়েছে একটি ধর্মীয় ও সামাজিক পুনর্জাগরণমূলক উদ্যোগ। সা’দায় জায়দি ঐতিহ্যকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় শিক্ষা ও পরিচয়কে শক্তিশালী করা। পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ যুক্ত হয়।
বইটির দশম অধ্যায়ে সা’দার ধর্মীয় পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে জায়দি শিক্ষার প্রসার এবং সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত সালাফি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার—দুইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছিল। সালাফি শিক্ষার বিস্তারকে অনেক জায়দি মানুষ নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব কমিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় জায়দি শিক্ষার জন্য ‘ইয়ুথফুল বিলিভার্স’ নামে একটি শিক্ষামূলক উদ্যোগ গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী হুতি আন্দোলনের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।
শিক্ষাক্রম নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ এবং জায়দি ধর্মীয় নেতাদের পরিবর্তে সালাফি প্রচারকদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উত্তেজনা বাড়িয়েছিল। অর্থাৎ, ধর্মীয় শিক্ষার প্রশ্নটি কেবল পাঠ্যসূচির বিতর্ক ছিল না; এটি ছিল কোন পরিচয় ও ঐতিহ্য রাষ্ট্রীয় পরিসরে জায়গা পাবে, সেই প্রশ্নও।
এই প্রতিযোগিতা থেকে অবশ্য সরাসরি যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল—এমন নয়। কিন্তু যখন ধর্মীয় পরিচয়, স্থানীয় ক্ষমতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ একসঙ্গে জমতে থাকে, তখন সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। হুতিদের আন্দোলন সেই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই বিকশিত হয়।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন: খাত, পোশাক, পরিবার ও সামাজিক আড্ডা
হুতিদের সম্পর্কে জানতে গেলে শুধু তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামরিক তৎপরতা দেখলে হবে না; ইয়েমেনের সমাজ কীভাবে চলে, সেটিও বুঝতে হবে। জিনি হিলের বইয়ের শুরুতেই দেশটির দৈনন্দিন জীবনের একটি দৃশ্য আছে, যা এই সমাজকে বোঝার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।
লেখক ইয়েমেনের রাজধানী সানার একটি রাস্তার দৃশ্য বর্ণনা করেছেন। একটি শিশু বড় মাপের প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরে রাস্তায় ছুটে বেড়াচ্ছে, বড় ভাইদের অপেক্ষা করতে বলছে। রাস্তার পাশে কয়েকজন পুরুষ বসে খাত চিবোচ্ছেন। তাদের গায়ে লম্বা সাদা পোশাক, আর তারা দেয়ালে হেলান দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। খাত চিবানোর ফলে তাদের গাল ফুলে আছে; মুখে সবুজ পাতার অবশিষ্টাংশ দেখা যাচ্ছে।
খাত ইয়েমেনের সামাজিক জীবনের একটি পরিচিত অংশ। এটি এক ধরনের উদ্ভিদের পাতা, যা চিবিয়ে হালকা উদ্দীপক প্রভাব অনুভব করেন অনেকে। বিকেলের দিকে খাত চিবানোকে কেন্দ্র করে পুরুষদের সামাজিক আড্ডা বসে; সেখানে ব্যক্তিগত কথা, স্থানীয় বিরোধ, ব্যবসা কিংবা রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এই অভ্যাস সব মানুষের নয়, এবং খাতের ব্যবহারকে হুতিদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবেও দেখা যায় না। এটি বৃহত্তর ইয়েমেনি সমাজের একটি পরিচিত সামাজিক রীতি।
এই দৃশ্যের তাৎপর্য হলো, ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও জীবন কেবল যুদ্ধ বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুরা খেলছে, মানুষ আড্ডা দিচ্ছে, পরিবারগুলো তাদের দৈনন্দিন কাজ করছে। কিন্তু এই স্বাভাবিক জীবনের পাশেই রয়েছে অস্ত্রের বিস্তার, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংঘাতের আশঙ্কা। বইটির শুরুতে দৈনন্দিন জীবনের এই ছবি তুলে ধরে লেখক কার্যত দেখিয়েছেন, বাইরে থেকে বিশৃঙ্খল মনে হলেও ইয়েমেনের সমাজের নিজস্ব নিয়ম ও অভ্যাস রয়েছে।
তবে এই সামাজিক দৃশ্যকে হুতি যোদ্ধাদের প্রতিদিনের জীবন বলে ধরে নেওয়া যাবে না। লেখক এখানে সানার সাধারণ জনজীবনের ছবি দিয়েছেন। হুতিদের নিজস্ব জীবনযাত্রা বুঝতে হলে এর সঙ্গে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা, স্থানীয় সামাজিক সম্পর্ক, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং সংগঠনের বিকাশকে মিলিয়ে দেখতে হয়।
গোত্র, আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্কের ভূমিকা
ইয়েমেনের সমাজে গোত্রীয় পরিচয়, আত্মীয়তা এবং স্থানীয় সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে মানুষ অনেক সময় নিরাপত্তা, বিরোধ মীমাংসা বা সহায়তার জন্য পরিবার, গোত্র ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করে।
জিনি হিলের বইয়ে দেখা যায়, হুতি পরিবার স্থানীয় সমাজে ধর্মীয় মর্যাদার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও প্রভাব তৈরি করেছিল। তবে লেখক এটিও দেখিয়েছেন যে, হুতিরা নিজেরা একটি নির্দিষ্ট গোত্রীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। বরং তারা গোত্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন সমর্থক গোত্রের মানুষকে নিজেদের সামরিক সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হুতিদের উত্থানকে শুধু ধর্মীয় পরিবারের প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। স্থানীয় সমাজে গ্রহণযোগ্যতা, আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক এবং গোত্রীয় সম্পর্ক তাদের সংগঠন বিস্তারে ভূমিকা রেখেছিল। আবার গোত্রগুলোও সব সময় একই পক্ষের সঙ্গে ছিল না। নিজেদের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও ক্ষমতার হিসাব অনুযায়ী কোনো কোনো গোত্র অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
অর্থাৎ, হুতিদের সামাজিক ভিত্তি একরকম বা স্থির ছিল না। এটি তৈরি হয়েছিল ধর্মীয় পরিচয়, স্থানীয় সম্পর্ক, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং যুদ্ধের বাস্তবতার সম্মিলনে।
২০০৪ সালের সংঘাত: আন্দোলন থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ
২০০৪ সালে সা’দায় প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের সরকারের সঙ্গে হুতিদের সংঘাত শুরু হয়। আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হুসেইন আল-হুতি এই সংঘাতের কেন্দ্রে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সরকারের বিরোধের মধ্যে ধর্মীয় বক্তব্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি সন্দেহ এবং উত্তরাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও জড়িয়ে ছিল।
হুসেইন আল-হুতি নিহত হওয়ার পর আন্দোলন থেমে যায়নি। তাঁর ভাই আবদুলমালিক আল-হুতি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে আন্দোলনটি আরও সংগঠিত সশস্ত্র শক্তিতে পরিণত হয়।
বইটিতে সা’দার যুদ্ধকে এমন একটি সংঘাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন ভেঙে পড়েছিল। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, আর বাইরের সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীদের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে।
লেখক সা’দার যুদ্ধক্ষেত্রকে এক ধরনের ‘ব্ল্যাক বক্স’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন—এমন এক জায়গা, যেখানে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল। সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা, স্থানীয় সূত্রের ওপর নির্ভরতা এবং দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবি সংঘাতের বাস্তবতা যাচাই করা কঠিন করে তুলেছিল।
যুদ্ধ কীভাবে দৈনন্দিন জীবন ভেঙে দেয়
সা’দার মানুষের দৈনন্দিন জীবন বোঝার সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদানগুলোর একটি হলো যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানোর অভিজ্ঞতা। বইয়ের শুরুতে লেখক মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি দৃশ্যের কথা বলেছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কালো পোশাক পরা এক নারী একটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখছেন—একসময় যেখানে রান্নাঘর ছিল, এরপর যেখানে ছিল বাথরুম। বাড়িটি আর বসবাসের উপযোগী নেই। নারীর প্রতিক্রিয়ায় ধরা পড়ে অবিশ্বাস ও শোক।
এটি কেবল একটি বাড়ি ধ্বংস হওয়ার ঘটনা নয়। একটি বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের নিরাপত্তা, রান্না, ঘুম, শিশুদের বেড়ে ওঠা, আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা এবং জীবিকা পরিচালনার জায়গা। যুদ্ধ সেই পরিচিত পরিসরকে অনিশ্চয়তায় পরিণত করে।
বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সা’দার দীর্ঘ সংঘাতের এক পর্যায়ে চারটি গভর্নরেটজুড়ে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছেছিল। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, সরকারি কর্মকর্তাদের অনীহা এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে অস্পষ্টতা ত্রাণ বিতরণে বাধা সৃষ্টি করেছিল।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য দৈনন্দিন জীবনের অর্থ বদলে যায়। আগে যে পথ দিয়ে বাজারে যাওয়া যেত, সেটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যে বাড়িতে পরিবার থাকত, সেটি পরিত্যক্ত হতে পারে। চিকিৎসা, খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মানুষকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। বইটি প্রতিটি পরিবারের আলাদা দিনলিপি দেয় না, কিন্তু যুদ্ধের এই চিত্র দেখায়—সশস্ত্র সংঘাতের মূল্য শুধু যোদ্ধারা দেয় না; সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয় বেসামরিক জীবন।
ধর্মীয় শিক্ষা, পরিচয় ও তরুণদের ওপর প্রভাব
হুতিদের উত্থানের সঙ্গে শিক্ষার প্রশ্নটি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। সা’দায় জায়দি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সালাফি মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। এই বিরোধ শুধু ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তরুণদের শিক্ষা, তাদের সামাজিক পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ধারণার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
তবে বইটি হুতিদের প্রত্যেক সমর্থকের শিক্ষাজীবন বা প্রতিদিনের ধর্মীয় অনুশীলনের বিস্তারিত বিবরণ দেয় না। তাই সব হুতি সমর্থক একই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন বা একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন—এমন দাবি করা যাবে না। বই থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তা হলো ধর্মীয় শিক্ষা ও পরিচয়ের প্রতিযোগিতা সা’দার রাজনৈতিক সংঘাতকে তীব্র করার একটি উপাদান ছিল।
পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনের তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক হতাশার কথাও বইটিতে এসেছে। ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বহু তরুণ দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ২০১৪ সালের দিকে লেখক যে সামাজিক পরিবেশের ছবি দিয়েছেন, সেখানে যুদ্ধের দৃশ্য টেলিভিশনে দেখছে এক তরুণ, একজন বয়স্ক নারী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, শিশুরা রাস্তায় ও বাগানে খেলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও জীবন চলছিল, কিন্তু মানুষের মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
এখানে হুতিদের সমর্থকদের সঙ্গে পুরো ইয়েমেনি তরুণ সমাজকে এক করে দেখা উচিত নয়। বরং বইটি দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে আস্থার সংকট বৃহত্তর সমাজকে অস্থির করে তুলেছিল। এই পরিবেশে সংগঠিত রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের অবস্থান বিস্তারের সুযোগ পায়।
সালেহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তারপর অপ্রত্যাশিত জোট
হুতিদের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাগুলোর একটি হলো সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের পরিবর্তন। যে সালেহ সরকার ২০০৪ সাল থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছিল, সেই সালেহই পরে তাদের রাজধানী সানা দখলের পথে সহায়ক হয়ে ওঠেন।
২০১১ সালে আরব বসন্তের আন্দোলনের মুখে সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন। তাঁর উত্তরসূরি আবদ রব্বু মানসুর হাদির সরকার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে পারেনি। জাতীয় সংলাপ, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং ফেডারেল কাঠামো নিয়ে মতবিরোধ চলতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে হুতিরা উত্তরাঞ্চল ছাড়িয়ে দেশের রাজনীতিতে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালে তারা আমরান অতিক্রম করে রাজধানী সানায় পৌঁছে যায়। এই অগ্রযাত্রায় সালেহের পুরোনো রাজনৈতিক ও গোত্রীয় নেটওয়ার্কের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের সঙ্গে সালেহের সাময়িক স্বার্থের মিল তৈরি হয়েছিল, কারণ দুই পক্ষই কিছু অভিন্ন প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে চাইছিল।
এই জোট ছিল সুবিধাভিত্তিক, আদর্শিক ঐক্যের ফল নয়। দীর্ঘদিনের শত্রুরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে পারে—ইয়েমেনের ঘটনাপ্রবাহ তার উদাহরণ।
ক্ষমতা দখলের পর হুতিদের ভূমিকা ও অভিযোগ
রাজধানী দখলের পর হুতিরা আর শুধু উত্তরাঞ্চলের বিদ্রোহী আন্দোলন ছিল না। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হয়।
জিনি হিলের বইয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আটক, সাংবাদিক ও সমালোচকদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগের সবগুলোর প্রমাণের মাত্রা এক নয়; তাই প্রতিটি ঘটনাকে একইভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তবে বইটি যে চিত্র তুলে ধরে, তাতে ক্ষমতা বিস্তারের সঙ্গে হুতিদের আচরণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কোনো আন্দোলন অতীতে বঞ্চনা বা দমন-পীড়নের শিকার হয়ে থাকলেও, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তার কর্মকাণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায্য হয়ে যায় না। একইভাবে, ক্ষমতায় গিয়ে কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ থাকলেও তার উত্থানের পেছনে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো অস্বীকার করা যায় না।
হুতিদের ইতিহাস বুঝতে হলে এই দুই দিকই বিবেচনায় রাখতে হবে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক: স্থানীয় শিকড়, আঞ্চলিক গুরুত্ব
হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সালেহের সরকার অভিযোগ করেছিল, ইরান হুতিদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে সা’দার সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানি রাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তার অভিযোগের পক্ষে কতটা শক্ত প্রমাণ ছিল, তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করা হয়েছিল।
বইটির আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুতিদের প্রাথমিক উত্থানকে শুধু ইরানের পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ কারণগুলো আড়ালে পড়ে যায়। সা’দার রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্রের দুর্বলতা এবং দীর্ঘ সামরিক সংঘাত তাদের স্থানীয় ভিত্তি গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল।
পরবর্তী সময়ে হুতিদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বাড়ার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সৌদি আরব হুতিদের অগ্রযাত্রাকে ইরানের প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে দেখে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকা এবং সেই গোষ্ঠীর জন্ম পুরোপুরি ওই রাষ্ট্রের নির্দেশে হওয়া এক বিষয় নয়।
হুতিদের বোঝার জন্য তাই স্থানীয় সমাজের ইতিহাস এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা—দুটিকেই আলাদা করে দেখতে হবে।
২০১৫ সালের যুদ্ধ: সা’দার সংকট থেকে আঞ্চলিক সংঘাতে
২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনে বিমান অভিযান শুরু হয়। হুতিদের অগ্রযাত্রা এবং প্রেসিডেন্ট হাদির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। এর ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।
জিনি হিলের বইটি ২০১৭ সালে প্রকাশিত। তাই এটি ২০১৫ সালের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং তার আগের রাজনৈতিক পটভূমি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পরবর্তী বছরগুলোর সব ঘটনা বা বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণ বিবরণ দেয় না।
যুদ্ধের বিস্তারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ে। বাস্তুচ্যুতি, ঘরবাড়ির ক্ষতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বাধা ইয়েমেনের সমাজকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ফেলে। হুতিদের উত্থানকে তাই শুধু সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখলে এর মানবিক মূল্য অনুধাবন করা যায় না।
হুতিদের জীবন বুঝতে গেলে যে বাস্তবতা সামনে আসে
হুতিদের সম্পর্কে প্রচলিত আলোচনা প্রায়ই তাদের অস্ত্র, নেতৃত্ব, বিদেশি সম্পর্ক এবং সামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু জিনি হিলের বই থেকে একটি বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়।
একদিকে রয়েছে সা’দার ধর্মীয় শিক্ষা, জায়দি পরিচয়, স্থানীয় পরিবার ও গোত্রের সম্পর্ক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। অন্যদিকে রয়েছে যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো মানুষ, বাস্তুচ্যুত পরিবার, বাধাগ্রস্ত ত্রাণ কার্যক্রম এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তরুণ সমাজ।
দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট দৃশ্য—রাস্তায় খেলতে থাকা শিশু, খাত চিবিয়ে আড্ডা দেওয়া পুরুষ, বাজার থেকে বাড়ি ফেরা নারী, ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরের সামনে দাঁড়ানো এক নারী—ইয়েমেনের সমাজের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। এসব দৃশ্য সব হুতির ব্যক্তিগত জীবনকে সরাসরি বর্ণনা করে না; বরং যে সমাজের ভেতর থেকে হুতিদের উত্থান, সেই সমাজের স্বাভাবিক জীবন ও যুদ্ধের অভিঘাত বুঝতে সাহায্য করে।
এই পার্থক্যই গুরুত্বপূর্ণ। হুতিরা কোনো বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড থেকে হঠাৎ উঠে আসা বাহিনী নয়। তারা ইয়েমেনের নির্দিষ্ট ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় আন্দোলনটি সশস্ত্র বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে, তারপর রাজধানী দখল করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছে। এই যাত্রায় স্থানীয় অসন্তোষ, ধর্মীয় পরিচয়, গোত্রীয় সম্পর্ক, রাজনৈতিক জোট, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ পরস্পরকে প্রভাবিত করেছে।
জিনি হিলের Yemen Endures বইটির মূল তাৎপর্য এখানেই। হুতিদের বুঝতে হলে শুধু তারা কীভাবে যুদ্ধ করে, তা জানলেই হবে না; তাদের উত্থানের পেছনে থাকা সমাজ, শিক্ষা, সম্পর্ক, বঞ্চনা ও ক্ষমতার রাজনীতিও বুঝতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং ক্ষমতায় গিয়ে তাদের ভূমিকার সমালোচনাও বিশ্লেষণের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
হুতিদের ইতিহাস তাই একদিকে প্রান্তিক অঞ্চলের আন্দোলনের জাতীয় ক্ষমতায় পৌঁছানোর গল্প, অন্যদিকে এমন একটি রাষ্ট্রের সংকটের ইতিহাস, যেখানে রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যর্থতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণ মানুষের জীবনকে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে।












